Sunday, April 14, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১৫১ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশলক্ষ্মীজনার্দন মন্দির, মধ্যবাড় (পিংলা, পশ্চিম মেদিনীপুর) প্রয়াত পিতৃপুরুষদের পারলৌকিক কাজের কথা উঠলে, প্রথমেই মনে আসে গয়াধামের কথা। রামায়ণে পাওয়া যায়, স্বয়ং রামচন্দ্র বনবাস কালে তাঁর পিতা দশরথের নামে পিণ্ডদান করেছিলেন গয়াতে।
সেকারণে, হিন্দুজনের আজীবনের আকাঙ্খা থাকে সেখানে, ফল্গু নদীর তীরে, শ্রীবিষ্ণুপাদ মন্দিরে, পূর্বপুরুষদের নামে পিণ্ড উৎসর্গ করবার।
দু’শ বছরের কিছু বেশি কাল আগের কথা। বর্ধমান জেলার কোনও এক গ্রাম থেকে একদল লোক গয়াধাম রওণা দিয়েছিলেন পিণ্ডদানের উদ্দেশ্যে। কোনও কারণে দেশে ফিরে আসতে কিছু অধিক বিলম্ব হয়েছিল ভাগ্যহত মানুষগুলির।
সেকালে গ্রাম নিয়ন্ত্রণ করতেন ব্রাহ্মণ সমাজ। সময়ে ফিরে না আসায়, গয়াগামীদের মৃত বলে ঘোষণা করে দিয়েছিলেন তাঁরা। ব্রহ্মণদের ফতোয়া মেনে, লোকগুলির শ্রাদ্ধশান্তিও করে ফেলতে হয়েছিল তাঁদের পরিবারগুলিকে।
কিছুকাল পরে, সুস্থ্য দেহমনে ফিরে এলেও, নিজের বাড়ি তো দূরের কথা, ব্রাহ্মণ আর গ্রামমুখ্যদের ফতোয়ায়, গ্রামেও ঢুকতে দেওয়া হয়নি তাদের কাউকেই। জীবিত থাকতেই, মৃতের তালিকায় নাম তুলে দেওয়া হয়েছিল লোকগুলির।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

এমনই মর্মন্তুদ ঘটনার শিকার এক ব্যক্তি আমাদের আজকের জার্ণালের কুশীলব। ভিটে-মাটি, পরিবার-পরিজন সব ছেড়ে, পথে নামতে হয়েছিল মানুষটিকে।
দামোদর পার হয়ে বাদশাহী সড়ক ধরে প্রথমে গড় মান্দারণ, পরে চন্দ্রকোণা নগরী ছাড়িয়ে, আরও দক্ষিণে পাড়ি দিয়েছিলেন মানুষটি। থেমেছিলেন সেকালের খান্দার পরগণার মধ্যবাড় নামের একটি গ্রামে পৌঁছে।
সেদিনের সেই অভিযাত্রীর নাম ছিল চতুর্ভূজ কুইলা। অনুমান করা যায়, যথেষ্ট সম্পদ সাথে নিয়েই দামোদর পার হয়েছিলেন তিনি। কেন না, অচিরেই খান্দার পরগ্ণায় পত্তনি বন্দোবস্ত নিয়ে, একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চতুর্ভূজ। হাতি ছিল, ঘোড়া ছিল তাঁর। হাতিশাল, ঘোড়াপোতা নামের জমিগুলি আজও তাঁর গৌরবের পরিচয় বহন করে চলেছে।
তখন নিম্নবঙ্গের মেদিনীপুর জেলা জুড়ে গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের প্রবল স্রোত বহমান। চতুর্ভূজও সেই স্রোতে অবগাহন করেছিলেন। ভগবান বিষ্ণুকে আরাধ্য করে, লক্ষ্মীজনার্দন নামের শালগ্রাম প্রতিষ্ঠা ও সেবাপূজার প্রচলন করেছিলেন।
লক্ষ্মীজনার্দনের মন্দিরটি গড়া হয়েছিল পঞ্চ-রত্ন রীতিতে। সামনে খিলানের তিন-দুয়ারী অলিন্দ। পিছনে এক-দুয়ারী গর্ভগৃহ। মন্দিরের মাথায় চালা-রীতির ঢালু ছাউনি দেওয়া। রথ-বিভাজন করা মাথার রত্নগুলিতে।
সামনের দেওয়ালে কার্ণিশের নীচে দু’সারি এবং দুই কোণাচের গায়ে দু’সারির প্যানেল। পুরাণ কাহিনীর মোটিফে, টেরাকোটা ফলক দিয়ে সাজানো হয়েছিল সৌধটিকে।
এছাড়া আছে গর্ভগৃহের দ্বারপথের দু’দিকে পূর্ণাবয়ব দুটি দ্বারপালক মূর্তি। মন্দিরের পশ্চিমের দেওয়ালে দুটি মিথুন মূর্তিও দেখা যায়।
জমিদারী উচ্ছেদের পর থেকে মন্দির আর সেবাপূজায় অবক্ষয়ের যে সূচনা হয়েছিল, তা আর রোধ করা যায়নি। মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে, বিগ্রহ সরিয়ে নিতে হয়েছে। ছোট একটি মন্দিরে রেখে সেবাপূজা হয় তাঁর।
বড় বড় গাছপালা, লতাগুল্ম ঢেকে ফেলছে পরিত্যক্ত মন্দিরটিকে। যেখানে একদিন মহা গৌরবে দেবতা অধিষ্ঠান করতেন, ক্রমে ক্রমে ইঁদুর বিছে বিষধর সরিসৃপের নিরাপদ আশয়স্থল হয়ে উঠেছে সেই গর্ভগৃহটি। তিলে তিলে সম্পূর্ণ অবলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে জীর্ণ সৌধটি। বুক ভাঙা দীর্ঘশ্বাস মোচন করা ছাড়া, এখন আর কিছু করবার সাধ্য নাই সেবাইত বংশের।
সাক্ষাৎকারঃ শ্রীমতি নীলিমা কৈলা। শ্রী শঙ্কর কৈলা—মধ্যবাড়।
সমীক্ষা সহযোগী এবং ২য় ছবিটির সৌজন্যঃ শ্রী প্রদীপ রাউৎ— ভাটবাড় ধনেশ্বরপুর।
পথ- নির্দেশঃ দ. পূ. রেলপথের বালিচক স্টেশন থেকে দক্ষিণে কিমি পনের উজিয়ে ১১ মাইল স্টপেজ। সেখান থেকে ১ কিমি পশ্চিমে মধ্যবাড় গ্রাম এবং কুইলাবংশের মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news