Monday, April 15, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৮২, রাহুল সাংকৃত্যায়ন: বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

ভারত বিশারদ
রাহুল সাংকৃত্যায়ন বিনোদ মণ্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

‘পূজার জন্য যেমন দরকার চন্দন,স্বাধীনতার জন্য তেমন দরকার রক্ত’। প্রতিটি দেশপ্রেমিক মানুষের রক্তে তুফান তোলা এই আহ্বান ছিল যাঁর, তিনি ভারত বিশারদ রাহুল সাংকৃত্যায়ন (০৯-০৪-১৮৯৩—১৪-০৪-১৯৬৩) ।
উত্তর প্রদেশের আজম গঞ্জে জন্মেছিলেন রাহুল। শৈশবে বাড়ি ছেড়ে চলে আসেন কলকাতায়। মাত্র তেরো বছর বয়সে। শিশুশ্রমিক হিসেবে বিনিদ্র রাত কেটেছে কলকাতার ফুটপাতে। বিচিত্র পেশায় জীবিকা নির্বাহ করেছেন। কখনো ফেরিওয়ালা, কখনো রেলের হেল্পার,কখনো কোনো বাড়ির রাঁধুনি। রাস্তার ধারে দোকানের সাইনবোর্ড ও পোস্টার দেখে দেখে ইংরেজি পড়তে শিখেছেন।
পিতৃদত্ত নাম ছিল কেদার নাথ পান্ডে। তথাকথিত হিন্দু ব্রাহ্মণ পরিবারের সন্তান।শৈশবে মাতৃহারা হন। বাবা গোবোর্ধন পান্ডে অবসর জীবনে কৃষিকাজে মেতে ছিলেন। মা-ফুলবন্তী দেবী। পাঠশালায় শিখেছিলেন উর্দু ও সংস্কৃত। অষ্টম শ্রেনি পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। মহাপণ্ডিত এই মানুষটি সারা জীবনে আয়ত্ত করেন ৩৬ টি ভাষা। বিশ্বের একাধিক দেশে করেছেন অধ্যাপনা, যে রেকর্ড হাতে গোনা কয়েকজন মনীষীর রয়েছে।
প্রথম শ্রেণিতে পড়বার সময় একটি প্রবাদ মনে গেঁথে যায় কেদারের ‘ওরে মূর্খ, ওরে অলস, যা বেরিয়ে পড়, বিশ্ব ভ্রমণ করে দেখ। এর জন্য তুই আর আলাদা কোনো জীবন পাবিনা। হয়তো বাঁচবি বহুদিন,কিন্তু এই সময়টা’ (যৌবন) আর ফিরে আসবে না। তখন থেকেই ভ্রমণের নেশায় পেয়ে বসে তাঁকে। পালিয়ে আসেন কলকাতায় ।
কখনো ভিক্ষা বৃত্তি করেছেন,মেতেছেন সাধুসংগে। বেদান্ত পাঠ ও শিক্ষা লাভের লক্ষ্যে চলে গেছেন কাশীধামে। হরিদ্বার,হৃষিকেশ, কেদার-বদ্রী,দেবপ্রয়াগ,যমুনোত্রী গঙ্ঙ্গোত্রীর পথে পথে পদব্রজে ঘুরে বেরিয়েছেন। চষে বেরিয়েছেন সারা দক্ষিণ ভারত। তিরুমিলি,পুরী থেকে মাদ্রাজ। ফাঁকে ফাঁকে শিখে নিয়েছেন হিন্দি, বাংলা,পালি, আরবি, ফারসি, তিব্বতি,তামিল ও ওড়িয়া ভাষা। ইরান, জাপান, কোরিয়া,সোভিয়েত ইউনিয়ন,চীন, শ্রীলঙ্কা, নেপাল গিয়েছেন। ভাষা আয়ত্ত করেছেন। তিব্বত গেছেন চারবার।
কোনো একটি বিশেষ ধর্ম বা রাজনৈতিক মতে বাঁধা পড়েননি। বর্ণময় মানুষটি বারাণসীর মঠে বৈষ্ণব মহণ্তের কাছে দীক্ষা নিয়েছেন। আবার নেপালে গিয়ে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। ২০ জুলাই ১৯৩০। পালি ও সিংহলি ভাষা শিখে মূল বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থগুলি পড়া শুরু করেন। নিজের নাম পরিবর্তন করে রাখেন রাহুল সাংকৃত্যায়ন। রাহুল বুদ্ধ পুত্রের নাম। এদিকে সাংকৃত্যায়ন কথার অর্থ হলো-অত্তীকরন করে যে। পরবর্তী কালে সারা পৃথিবীর বুধমন্ডলী তাঁকে এই নামে চিনে নিয়েছেন।
ধর্ম ও অধ্যাত্মপথের অনুসারী মানুষটি ভারতবর্ষের প্রতিটি প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্রে গিয়ে উপলব্ধি করেছেন- ভারতবর্ষ সারা পৃথিবীর সাংস্কৃতির মহামিলন ক্ষেত্র। পরমাত্মা। এ হেন পর্যটকের জীবনে পট পরিবর্তন ঘটে ১৯১৯এ। জালিয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস বর্বরোচিত হত্যাকান্ডের ঘটনায়। রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। তিন বছর জেলে কাটাতে হয়। অবসন্ন হন নি। বরং জেলে বসে (হাজারিবাগ জেল, বক্সার জেল,দেউলি জেল) দুরূহ অনুবাদ কর্ম শেষ করেন। কুরআন শরিফের সংস্কৃত ভাবানুবাদ।
জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বিহারে যান। ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদের সান্নিধ্যে প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই সময় গান্ধীবাদ আকৃষ্ট করে তাঁকে। দুনিয়া কাঁপানো রুশ বিপ্লবের মর্মবাণীকে ও উপেক্ষা করতে পারেন না। শুরু হয় মার্ক্সবাদ নিয়ে নিবিড় অনুশীলন। পরে ইংল্যান্ড ও ইউরোপের দেশ গুলি ভ্রমণ করেছেন (১৯৩২)। স্বপ্নের সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত রাশিয়া গেছেন (১৯৪৪)। অসাধারণ এই তাত্ত্বিক দার্শনিককে চিনে নিতে ভুল করেননি রুশ সরকার। ১৯৪৪-৪৭ কাল পর্বে লেনিনগ্রাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার কাজে বরণ করে নিয়েছে।
জাতীয় কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নিয়ে আগে ও একবার মাস ছয়েক জেল খেটেছেন। নেপালে রাজনৈতিক বক্তৃতা দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। ধীরে ধীরে সারস্বত সাধনায় ব্রতী হয়েছেন। তাঁর সব চেয়ে আলোচিত গ্রন্থটির খসড়া নির্মিত হয়েছে জেলের মধ্যে। ভোলগা থেকে গঙ্গা (১৯৪৩)। ২০টি গল্পের সংকলন এই গ্রন্থটি বিশ্ব সাহিত্যে অনবদ্য সংযোজন। ৬০০০খৃস্ট পূর্বাব্দ এ ভোলগা নদীর তীরে যে মানবগোষ্ঠী পরিবারের রূপকে সংহত করেছিল তার বিকাশের বিবর্তিত রূপ এসে সমাপ্ত হয়েছে বিশ শতকে। যদি ও হিন্দি ভাষাভাষি এলাকার একাংশ সে সময়ে এই গ্রন্থের বৈজ্ঞানিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণ হজম করতে পারেননি। তুমুল বিরোধিতা, বিতর্ক ও নিন্দার ঝড়ে ও অটল ছিলেন রাহুল।
কুড়ি বছর বয়েস থেকে নিয়মিত দিনলিপি লেখা শুরু করেন তিনি। যা তাঁর প্রতিটি গ্রন্থের বিষয় নির্মাণে সহায়ক হয়েছে। কী লেখেননি তিনি? প্রবন্ধ,আত্মজীবনী,নাটক, উপন্যাস, বড়ো ও ছোট গল্প,ভ্রমণকাহিনী, রাজনীতি,বিজ্ঞান, ধর্মগ্রন্থ,দর্শন, লোকসাহিত্য, সাহিত্যের ইতিহাস,ইতিহাসের অনুবাদ এমনকি অভিধান সংকলিত করেছেন।
কোনো কোনো গবেষক উল্লেখ করেছেন, তিনি তিনবার বিবাহ করেছেন। তবে সর্বপেক্ষা গ্রহণযোগ্য মত হলো ৫৭ বছর বয়সে ভারতীয় বংশোদ্ভূত নেপালী মহিলা কমলা দেবীর সাথে তাঁর পরিণয় সম্পন্ন হয় (১৯৪৯)। তাঁদের দুই সন্তান-কন্যা জয়া ও পুত্র জিত। নব জাগরণ থেকে স্বাধীনতা-অখণ্ড কাল পর্বে বার বার ছুটে গেছেন তিব্বতে। আবিষ্কার করেছেন ৩৬৮টি পুথি। ফটোগ্রাফির নেশা ছিল তাঁর। পাটনার জাদুঘরে ৫৫টি দুষ্প্রাপ্য চিত্র সন্নিবেশিত হয়েছে। ১৯৩৮ সালে তিব্বত অভিযান থেকে ফিরে অল ইন্ডিয়া কিষান সভার সভাপতি হয়েছেন রাহুল।
তাঁর প্রায় সব গ্রন্থই বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়েছে। আজ ও বই মেলায় নবীন পাঠকের অন্বেষু চোখ তাঁকে খুঁজে ফেরে। এটাই বাঙালির দেওয়া শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি। এলাহাবাদ হিন্দি সাহিত্য সম্মেলন তাঁকে ‘সাহিত্য বাচস্পতি’ অভিধায় ভূষিত করেছে। ১৯৫৮সালে পেয়েছেন অকাদেমি পুরস্কার।পদ্মভূষণ সম্মান লাভ করেছেন(১৯৬৩)।
শেষ জীবনে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন শ্রীলঙ্কায়। ১৯৫৯ থেকে ৬১ পর্যন্ত সেখানে অধ্যাপনা করেছেন। তাঁরা রাহুলকে ‘ত্রিপিটকার্য’ উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এখানকার বিদ্যালঙ্কার বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সময়েই অসুস্থ হন রাহুল। ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, এর পরিণতিতে একসময় মস্তিষ্কে রক্ত ক্ষরণ শুরু হয়। ১৯৬১ সালের ডিসেম্বরে স্মৃতিভ্রংশ হতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়নে যান চিকিত্সার জন্য। প্রায় সাত মাস রুশ চিকিত্সকগণ চেষ্টা করে ও তাঁকে আরোগ্য দানে ব্যর্থ হন।
অবশেষে দার্জিলিং এর হিডেন হাসপাতালে প্রয়াত হন হিন্দি ভ্রমণ সাহিত্যের জনক। তাঁর প্রিয় তীর্থ কাশীর পণ্ডিত সমাজ যাঁকে ‘মহাপণ্ডিত’ আখ্যায় মহিমান্বিত করেছিলেন।

- Advertisement -
Latest news
Related news