Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৯৯ ।। যামিনী রায়।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

ছবির জাদুকর
যামিনী রায় বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তর টালমাটাল পৃথিবী তাঁর সৃষ্টি সুখের উল্লাসে মুখরিত। বিশেষত: ইউরোপের শিল্পোন্নত দেশগুলো থেকে শিল্পীকে বার বার আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তিনি যাননি কোথাও। এমনকি স্বাধীনতার পরও কখনো বিদেশে পা রাখেননি। চিত্রশিল্পীর অহংবোধ নিয়ে বলেছেন, ‘আমরা গরীব দেশের মানুষ। এত পয়সা খরচ করে ওদের দেশে যাব কেন ? ওদের অনেক পয়সা ,ওরা এসে আমাদেরটা দেখে যাক।’ ইনি ছবির জাদুকর যামিনী রায় ( জন্ম –১১.৪.১৮৮৭)।

জন্মেছিলেন বাঁকুড়া জেলার বেলিয়াতোড়ে। বাবা ছিলেন ক্ষয়িষ্ণু জমিদার রামতারণ রায়। মা নগেন্দ্রবালা। যশোরের রাজা প্রতাপাদিত্যের সংগে পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেও মূলতঃ কৃষিকাজ করেই গ্রাসাচ্ছাদন হত পরিবারের। তবে রামতারণের রক্তে ছিল শিল্প ক্ষুধা। নিজে ছবি আঁকতেন। গ্রামের কুমোর পাড়ায় গিয়ে ঠাকুর বানানো দেখতেন। অতৃপ্ত শিল্পসাধনার স্বপ্ন বাস্তবায়িত করতে সন্তানকে ভর্তি করে দেন কলকাতার ‘মর্ডান কলেজ অব আর্ট’ প্রতিষ্ঠানে। সেখানে তখন সহ -অধ্যক্ষ পদে আসীন ছিলেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।
শিল্পাচার্য্য অবন ঠাকুর ‘বেঙ্গল স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করে দেশীয় তরুণদের মধ্যে প্রতিভা অন্বেষণে রত ছিলেন। যামিনী রায় তাঁর কাছেই প্রথম প্রথাগত প্রশিক্ষণ পেয়েছেন। তিনি যামিনীর প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে যান। বিশেষত সামনে মডেল বসিয়ে কোনো প্রতিকৃতি নির্মাণে যামিনী ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাছাড়া ইউরোপীয় প্রথায় ছবি থেকে ছবি আঁকবার মুন্সিয়ানাও ছিল অসাধারণ। ছাত্রের প্রতি অপার মুগ্ধতায় অবনীন্দ্রনাথ যামিনীকে কাছে টেনে নেন। শুধু তাই নয়, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি অসাধারণ প্রতিকৃতি তাঁকে দিয়ে আঁকিয়ে নেন।

১৯০৬ সালে ‘সমাজ’ নামক ছবি এঁকে প্রথম তাক লাগিয়ে দেন যামিনী রায়। বাঁকুড়ার জেলাশাসক এই ছবি দেখে যামিনীকে একটি গিনি উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন। আর্ট কলেজে ইতালীয় চিত্রশিল্পী গিলার্দি এবং ব্রিটিশ অধ্যক্ষ পার্সি ব্রাউন তাঁকে খুব স্নেহ করতেন। ব্রাউন সাহেবের বদান্যতায় আর্ট কলেজে যখন ইচ্ছে যেকোনো শ্রেণির ক্লাসে উপস্থিত থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন যামিনী রায়। যদিও ক্লাসে তিনি গরহাজির থাকতেন প্রায়শঃই। কলকাতার ফুটপাথ, চলমান জীবন , গাছপালা পাখ পাখালি, নদনদী এবং কালীঘাটের পটুয়া পাড়া তাঁকে বেশি আকর্ষণ করত। নিজেকে পটুয়া পরিচয়ে তুলে ধরতে ভালোবাসতেন। ১৯০৮ সালে তিনি ডিপ্লোমা অফ ফাইন আর্টস ডিগ্রি অর্জন করেন।
খড়িমাটি , ভূষাকালি ,ইঁটের গুঁড়ো, কাজল ,লাল সিঁদুর, আলতা, সাদা খড়ি, কাঠকয়লা, ফুল ও লতা পাতার রস, হরিতাল, হিংগুল এমন কি চিমনির ধোঁয়া-জমা কালি ব্যবহার করেছেন ছবিতে। একসময় সমতল ক্যানভাস ত্যাগ করে অসমতল ক্যানভাসে ছবি আঁকতে শুরু করেন।কাগজ বোর্ড কাপড় ব্যবহার করেছেন ক্যানভাস হিসেবে। মাঝে মাঝে মূল ক্যানভাসের ওপর কাদামাটি বা চুনের প্রলেপ লাগিয়ে জমি তৈরি করেছেন। এছাড়া প্রথাগত জলরং ও তেলরং উভয় পদ্ধতি তিনি অনুসরণ করেছেন আজীবন।

দেশজ শিল্পশৈলী, আদিবাসী শিল্পরীতির প্রতি অন্তরের টান ছিল বরাবর। ছোট ছোট স্টোকের মাধ্যমে জীবন্ত হয়ে ওঠা কালিঘাটের পটগুলি তাঁকে প্রাণিত করে। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত এই লোকায়ত ঘরানায় আবিষ্ট থেকেছেন যামিনী রায়। এই সময় কয়েকজন ব্ন্ধু মিলে ইন্ডিয়ান একাডেমি অব আর্টস নামে একটি শিল্প পত্রিকার ত্রৈমাসিক প্রকাশ শুরু করেন। সেখানে অন্যদের সাথে নিয়মিত তাঁর ছবিগুলো প্রকাশিত হয়। বাংলার বিদগ্ধ শিল্পীমহলের খ্যাতি অর্জন করেন। সেকালের বিদগ্ধ কবি ও শিল্পরসিক অধ্যাপক সুধীন্দ্রনাথ দত্ত লিখেছেন -“যামিনী রায়ের এসব ছবি চিত্রের বিশুদ্ধতা রেখেও তীব্রভাবে নাটকীয়, মানবিকতায় ধনী, চরিত্রের প্রতি তাঁর অন্তর্দৃষ্টি সূচীমুখ !”
শিল্পীর এই শিল্পসিদ্ধির পেছনে তাঁর স্ত্রী আনন্দময়ীর অবদান অনস্বীকার্য। একসময় অভাবে পড়ে সংসার চালানোর জন্য রং তুলি ছেড়ে পার্টটাইম কাজ করতে হয়েছে। ছাপাখানায় কখনো ইলাস্ট্রেশন থেকে মুদ্রণ সহায়কের ভূমিকা পালন করেছেন। শ্যামবাজারে কাপড়ের দোকানে সেলসম্যানের কাজ করেছেন। পরম মমতায় তাঁর শিল্পী সত্তাকে আগলে রেখেছেন আনন্দময়ী। ১৯৩৭ সালের পর তাঁর ছবির চাহিদা ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এইসময় অধ্যাপক সাহিদ সুরাওয়ার্দি তাঁর একটি প্রদর্শনী দেখে মুগ্ধ হন, অভিনন্দিত করেন।

প্রখ্যাত শিল্প গবেষক বি. নিকলসের “ভার্ডিকট অন ইন্ডিয়া” গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে ভূয়সী প্রশংসা প্রকাশিত হলে ইউরোপীয় শিল্পীমহলে তাঁর প্রতি বিশেষ আগ্রহ সৃষ্টি হয়। প্রায় রাতারাতি বিশ্ববরেণ্য শিল্পীতে উন্নীত হন যামিনী রায়। ১৯৪৬ সালে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় লন্ডন শহরে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন সৈনিক ও অফিসাররা তাঁর ছবি চড়া দামে কিনে দেশে নিয়ে গেছেন। যুদ্ধ ফেরত ভারতে স্মৃতি হিসেবে বাড়ির ড্রইং রুমে সাজিয়ে রাখবার জন্য। ইউরোপীয় ধারায় ছবি আঁকতে গিয়ে পল সেজান, ভ্যান গগ, পাবলো পিকাসো, গঁগ্যা প্রমুখের শৈলীকে আত্মস্থ করেছেন তিনি। অনুকরণ করেননি। নিজস্ব ঘরানার সৃষ্টি করেছেন। নিজেই যার নাম দিয়েছেন – ‘ফ্ল্যাট টেকনিক’ ।

সারা জীবনে দশ হাজারেরও বেশি ছবি এঁকেছেন যামিনী রায়। তাঁর বিশ্ববিখ্যাত ছবির কয়েকটি হল — বেড়াল ও চিংড়ি মাছ , গোপিনী, নৃত্যরত রাধাকৃষ্ণ, কৃষ্ণ এবং গোপিনী নৌকাবিহারে, শ্রীকৃষ্ণ ও বলরাম, মকর, রাবণ সীতা এবং জটায়ু , বৈষ্ণব, তিনকন্যা , সাঁওতাল রমণী , বাঘের ওপর রানী ইত্যাদি। তাঁর খেজুরপাতার চাটাইয়ের ক্যানভাসে আঁকা যিশুর চিত্রমালা প্রসিদ্ধ। গ্রাম বাংলার পাশাপাশি পুরাণ ও মহাকাব্যের প্রতি ঝোঁক তাঁর সৃষ্টিসম্ভারকে বর্ণময় ও বিচিত্র ওজস্বিতা দান করেছে। ১৯৪৪ সালে ১০৬ সেমি লম্বা ও ৭৬ সেমি চওড়া ১৭টি ক্যানভাসে রামায়ণের কাহিনীমালা চিত্রায়িত করেছিলেন
যামিনী রায়। কালীঘাট পটচিত্র শৈলীতে রূপায়িত এই শিল্পমালা ন্যাশনাল গ্যালারি অব আর্ট, ইন্ডিয়া এবং ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে প্রদর্শিত হয়েছে। পাশাপাশি তাঁর আঁকা ‘রাজকন্যা ও দুই সহচরী’ ছবিটিও বিশ্বখ্যাত। লাল নীল সবুজ গেরুয়া ধূসর রঙের গাঢ় টানে অপরূপ শিল্প সম্ভার নির্মাণ করেছেন যামিনী রায় ।

দীর্ঘদিন ভাড়া বাড়িতে কাটানোর পর ১৯৪৮ সালে নতুন বাড়ি বানিয়ে তৃপ্তি পেয়েছিলেন এই আত্মমগ্ন শিল্পী। শ্রীরামপুরে, এখন যা বালিগঞ্জ প্লেস ইস্ট। বাড়ির নিচতলা জুড়ে নিজের স্টুডিয়ো ও আর্ট গ্যালারি বানিয়ে তোলেন। দোতলায় বসবাস করেন। সারা বাড়ি নানা আঙ্গিকের শিল্প ভাস্কর্য, গ্রামীণ পোড়া মাটির পুতুল দিয়ে সাজানো হয় ।

আজীবন নানা পুরস্কারে ভূষিত হন শিল্পী। ১৯৩৪ সালে ভাইসরয় এর স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে পান ‘পদ্মভূষণ’ সম্মান। ১৯৫৫ সালে ললিত কলা একাডেমির ফেলো নির্বাচিত হন। লন্ডনের বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া এন্ড এলবার্ট মিউজিয়ামসহ পৃথিবীর বহু বিখ্যাত শহরের মিউজিয়ামে ও গ্যালারিতে তাঁর ছবি সংরক্ষিত আছে। ১৯৭৬ সালে ভারত সরকারের সংস্কৃতি দপ্তরের অধীনস্থ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ তাঁর ছবিগুলিকে জাতীয় সম্পদের মর্যাদা ও গরিমা প্রদান করেছে।

বাংলা নাট্যমঞ্চের জন্য তাঁর মেধা ও প্রতিভা প্রয়োগ করেছিলেন যামিনী রায়। শিশির ভাদুড়ী ,যোগেশ চৌধুরী, অহীন্দ্র চৌধুরী ছিলেন তাঁর বন্ধুপ্রতিম নাট্য শিল্পী। তাঁদের মঞ্চ নির্মাণে পরামর্শ দান করেছেন নিয়মিত। ১৯৭০ সালে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন যামিনী রায়। পুরোপুরি সুস্থ হওয়া হয়ে ওঠেনি আর। ভেঙে যায় শরীর ।
অবশেষে ১৯৭২ সালের ২৪ এপ্রিল ৮৫ বছর বয়সে রং তুলির চংক্রমণ স্তব্ধ হয়ে যায়। প্রয়াত হন যামিনী রায় ।

- Advertisement -
Latest news
Related news