Tuesday, June 25, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-৭৬ ।। হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায় ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

ভারতীয় সাংবাদিকতার জনক
হরিশ মুখোপাধ্যায়

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

বিনোদ মন্ডল

মৃত্যুর আগে জ্বরের ঘোরে একটি মানুষ ক্রমাগত অস্ফুট আকুতি করছেন – ‘গিরীশ গিভ দ্য প্রুফ! গিভ দ্য মেশিন প্রুফ প্লিজ। ‘ বাস্তবে তাঁর শেষ কথাটুকু ছিল – “ওরে পেট্রিয়ট মেশিনে ওঠাসনে। প্রুফটা আর একবার আমাকে দিয়ে দেখিয়ে ,তবে ছাপিস।” তিনি হরিশ্চন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সংক্ষেপে হরিশ মুখুজ্জে (১৪.০৭. ১৮২৪ — ১৪.০৬. ১৮৬১)।
উনিশ শতকের নবজাগরণের ইতিহাস তাঁকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। তিনি এদেশের বুকে নির্ভীক সাংবাদিকতার সূচনা করেন। বিশেষতঃ ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক সাংবাদিকতার ধ্যান ধারণা নিয়ে প্রথম চর্চা তাঁর। হাতিয়ার ছিল হিন্দু পেট্রিয়ট।

১৮৫৩ সালের ৬ জানুয়ারি মধুসূদন রায় “হিন্দু পেট্রিয়ট’ প্রকাশ করেন। শ্বেতাঙ্গদের ‘ইংলিশম্যান’ কাগজের বিকল্প হিসেবে পেট্রিয়টের পথ পরিক্রমা। হরিশ এখানে নিয়মিত কলম ধরা শুরু করেন। সাপ্তাহিক কাগজ। মাত্র তিন মাসের মধ্যে সম্পাদক হন তিনি। আমৃত্যু এই কাগজের মাধ্যমে স্বদেশ প্রেমের উজ্জ্বল নিদর্শন তুলে ধরেছেন। প্রতি বৃহস্পতিবার সমস্ত বাধা, প্রতিবন্ধকতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অর্থ কষ্ট, রাজরোষকে জয় করে প্রকাশিত হতো ‘হিন্দু পেট্রিয়ট।”
পিতা রামধন মুখোপাধ্যায় ছিলেন বর্ধমানের কুলীন ব্রাহ্মণ। মাতা রুক্মিনী দেবী তাঁর চতুর্থ স্ত্রী। দিদিমার বাড়ি ভবানীপুর তখন গণ্ডগ্রাম। এখানেই কাটিয়েছেন আজীবন। স্কুলে পড়বার সময় মায়ের নির্দেশে বিয়ে করেন। মোক্ষদাসুন্দরীকে। একটি কন্যা সন্তান জন্মের কিছুদিন পর মারা যায়। দ্বিতীয়বার পুত্রসন্তান। তাকে রেখে প্রয়াত হন মোক্ষদা। অগত্যা ছেলেকে লালনপালন করার তাগিদে আবার বিয়ে করেন, ভগবতী দেবীকে। সে বিয়ে সুখের হয়নি। সাংসারিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত মানুষটি মদের প্রতি আসক্ত হন। যার পরিণামে মাত্র ৩৭ বছরে নিবে যায় জীবনদীপ।

আপসহীন সাংবাদিক হিসেবে কলমের চাবুকে কশায়িত করেছেন শ্বেতাঙ্গ শাসককে। তাঁদের মধ্যে অবশ্য অনেক মানবদরদী ইংরেজ সহৃদয়তার সংগে সহায়তা করেছেন হরিশকে। যেমন রেভারেন্ড পিফার্ড সাহেবের সুপারিশে এই দরিদ্র কুলীন কিশোরটি ভবানীপুরের ইউনিয়ন স্কুলে ভর্তি হন। কিন্তু সেই স্কুলেই এক শ্বেতাঙ্গ ইংরেজকে মাটিতে ফেলে বেদম প্রহার করেন ছাত্র হরিশ। কেননা উদ্ধত ঐ মানুষটি প্রকাশ্যে ভারতীয় ছাত্রদের ‘ব্লাডি ইন্ডিয়ান নিগার’ বলে গালি দেন ।
ক্ষুন্নিবৃত্তির কারণে অল্প বয়সে চাকরি নিতে হয়। স্বল্প বেতনে। ‘টলা এন্ড কোম্পানি’তে নেটিভ রাইটারের চাকরি। অফিস কলুটোলায়। দ্বিতীয় চাকরির পেছনে অন্য এক সহৃদয় ইংরেজের অবদান ছিল। জেমস ম্যাকেঞ্জি। এবারে মিলিটারি জেনারেল অডিটারের অফিসে। এখানে সহকর্মী হিসেবে পান গিরিশচন্দ্র ঘোষকে। এই সময় ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরিতে লাইব্রেরিয়ান ছিলেন প্যারিচাঁদ মিত্র। তাঁর সংগে ঘনিষ্ঠতা বাড়ে হরিশের। এই পাঠাগার হয়ে ওঠে তাঁর তীর্থক্ষেত্র।
যে অফিসে ২৫ টাকা বেতনে চাকরিতে ঢোকেন সেখানেই তিনি অতিদ্রুত পদোন্নতি লাভ করেন। ক্রমে ১০০ টাকা বেতন হয়। যখন মারা যান তখন তিনি সহকারী অডিটার জেনারেলের পদে বৃত ছিলেন। বেতন ছিল ৪০০ টাকা। একসময় পেট্রিয়ট মালিকের অনুরোধে ঋণগ্রস্ত কাগজ বাঁচাতে তার মালিকানা কিনে নেন। নিজে রাজ কর্মচারী, ফলে দাদা হারানচন্দ্রের নামে মালিকানা হস্তান্তরিত হয় ।

প্রতি মাসে প্রাপ্ত বেতনের প্রায় অর্ধেক চলে যেত পেট্রিয়টের পেছনে। এই কাগজ ব্যবসায় আপন দক্ষতা ও মেধা প্রয়োগের দ্বারা পরে মাসে চারশো টাকা লাভ করতেন হরিশ। যা ব্যয়িত হতো দরিদ্র দেশবাসীর সেবায়। নাট্যকার দীনবন্ধু মিত্র তাঁর প্রয়াণের পর যে স্মরণসভার আয়োজন করেন, সেখানে লিখিত বক্তৃতা পাঠ করেন। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘হরিশের লেখা যে একবার পাঠ করে সে-ই মোহিত হয় এবং তৎক্ষণাত্‍ তাঁহার জগৎ বিখ্যাত হিন্দু পেট্রিয়টের গ্রাহক হয়।…..কেবল বঙ্গদেশ কেন বলিতেছি, ভারতবর্ষময় হিন্দু পেট্রিয়ট এর গৌরব হইয়াছে। কী মাদ্রাজ, কী মুম্বাই, কী লাহোর, কী আগরা সকল স্থানেই হিন্দু পেট্রিয়টকে অতি সাহসী সংবাদপত্র বলিয়া গণ্য করে। ইংল্যান্ডেও হিন্দু পেট্রিয়টের অতিশয় আদর হইয়াছে।”
ব্রাহ্ম ধর্মে দীক্ষিত হন হরিশ। যুক্ত হন তাঁদের নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে। কাগজে নিয়মিত তা প্রকাশ করেন। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আ্যসোসিয়েশন (১৮৫১) প্রতিষ্ঠিত হলে সেখানেও এক সময় সক্রিয় সদস্য হয়ে ওঠেন নিজগুণে। চাঁচাছোলা ভাষায় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতায় শাসকের নিদ্রাহরণ করতেন নিয়মিত। লর্ড ডালহৌসির সাম্রাজ্য বিস্তার নীতির কঠোর সমালোচনা করে কলাম লিখতেন। শোনা যায়, লোভনীয় বেতনের টোপ দিয়ে তাঁকে চাকরির অফার দেন, ডালহৌসি, যা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন হরিশ। যদিও পরবর্তীকালের গভর্নর লর্ড ক্যানিং তাঁর লেখার গুণমুগ্ধ ছিলেন। ছিলেন পেট্রিয়টের গ্রাহক ও পাঠক।
হরিশ্চন্দ্র, সরকারের প্রতিটি জনবিরোধী নীতির সমালোচনা করতেন। সরকারের আমদানি রপ্তানী নীতি নিয়ে ধারাবাহিক লেখা শুরু করলেন। ভারত থেকে দামী চাল ,চিনি, তৈলবীজ ঢালাও বিদেশে চালান করা হতো। আমদানি করা হতো মদ ,হোশিয়ারি দ্রব্য, বিলাস সামগ্রী। এছাড়াও পতিতা সমস্যা এবং সরকারের কেরানি গড়া শিক্ষানীতির সমালোচনা করেন তিনি।

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিধবাবিবাহ প্রচলন করতে গিয়ে হরিশের আন্তরিক সহযোগিতা পেয়েছেন। তিনি বিধবাবিবাহ প্রচলন ও বহু বিবাহ রোধ নিয়ে অসংখ্য প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগরের প্রকাশিত বিধবাবিবাহ সংক্রান্ত প্রস্তাব পুস্তিকা প্রকাশিত হওয়ার পর জনমত গঠনে তাকে নিয়ে নিরন্তর প্রয়াসী হন। সংস্কৃত ভাষার প্রসার এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার পক্ষে সওয়াল করতেন হরিশ।
সমকালীন প্রতিটি রাজনৈতিক ঘটনায় আলোড়িত হয়েছেন তিনি। সামাজিক আন্দোলনের জন্য কাগজে তার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেছেন। জমিদার ও ধনাঢ্য দেশীয় মানুষদের শ্বেতাঙ্গ প্রীতি নিয়ে কটাক্ষ করতেন। পাশাপাশি নিরন্ন অসহায় দরিদ্র দেশবাসীর জন্য তাঁর দুয়ার সবসময় উন্মুক্ত ছিল। সিপাহি বিদ্রোহকে তিনিই প্রথম ‘দি গ্রেট ইন্ডিয়ান রিভোল্ট’ আখ্যা দেন।
নীলকর সাহেবদের অত্যাচারে বিধ্বস্ত গ্রামবাসীদের নিয়ে নিয়মিত বর্ণনা ছাপা হতো পেট্রিয়টে। হরিশের বয়ান – ‘যে উদ্ধত চোখে ওরা আমাদের দেশের মানুষকে মানুষ বলেই দেখে না, দুঃখের কথা, ওদের সেই উদ্ধত চোখে আরো ঔদ্ধত্যের সুর্মা পরিয়ে দেওয়ার জন্য আমাদেরই দেশের একদল মানুষের চেষ্টার ত্রুটি নেই।’
কাগজে প্রত্যক্ষদর্শী সংবাদদাতার প্রচলনে তিনিই এদেশে রূপকার। নীলচাষিদের দুর্গতি সরজমিনে তুলে ধরতে তিনি নদীয়ার গ্রামাঞ্চলে পাঠান হরিনাথ মজুমদারকে। কুমারখালির এই সাংবাদিকই পরে ‘কাঙাল হরিনাথ’ নামে খ্যাত হয়েছেন । ‘নীলদর্পণ’ নাটক লেখার পর দীনবন্ধু মিত্র তাঁর সাথে দেখা করতে আসেন। পরে যা গ্রন্থাকারে (১৮৬০) প্রকাশিত হয়।

অমানুষিক পরিশ্রমে, নিদ্রাহীনতায় অকালে চলে যেতে হয় তাঁকে। হাঁপানি ও শ্বাসকষ্ট আশৈশব সঙ্গী ছিল। লাগাতার জ্বরে ভোগা মানুষটিকে ব্ন্ধু রমাপ্রসাদ (রামমোহনের পুত্র) জোর করে নিজের আমহার্স্ট স্ট্রিটের বাড়িতে তুলে নিয়ে যান। ডাঃ এডোয়ার্ড গুডিফ এবং ডাঃ নীলরতন মুখোপাধ্যায় চিকিৎসা শুরু করেন ।যক্ষ্মা ধরা পড়ে। শেষ রক্ষা করা যায় নি।
কালীপ্রসন্ন সিংহ বলেন — ‘লক্ষ লক্ষ গরীব নীলচাষি এবার পিতৃহীন হয়ে যাবে’। শেষ শয্যায় দেখা করে যান , নীল আন্দোলনের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক রেভারেন্ড জেমস লঙ। লোককবি স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় গ্রামে গ্রামে গেয়ে বেড়ান – ” নীল বাঁদরে সোনার বাংলা/ করলে এবার ছারখার।/ অসময়ে হরিশ মলো/ লঙ এর হলো কারাগার ।★

- Advertisement -
Latest news
Related news