Saturday, April 20, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১১০: জীবনানন্দ দাশ: বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

বাংলার ত্রস্ত নীলিমা
জীবনানন্দ দাশবিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

মৃত্যুর আগে মানুষটির শেষ উক্তি ছিল -“ধূসর পাণ্ডুলিপির রং সারাটা আকাশ জুড়ে”। যিনি একদিন লিখেছেন অবিনাশী পংক্তিমালা– মাটি- পৃথিবীর টানে মানব -জন্মের ঘরে কখন এসেছি /না এলেই ভালো হতো অনুভব করে;/ এসে যে গভীরতর লাভ হলো সে সব বুঝেছি /শিশির শরীর ছুঁয়ে সমুজ্জ্বল ভোরে ;/দেখেছি যা হলো হবে মানুষের যা হবার নয় -/শাশ্বত রাত্রির বুকে সকলই অনন্ত সূর্যোদয়।” কলকাতা ট্রাম পরিবহণের ইতিহাসে বিষন্নতম দুর্ঘটনার শিকার হন যিনি — তিনি জীবনানন্দ দাশ (১৭.০২. ১৮৯৯ — ২২.১০. ১৯৫৪)।

১৪ অক্টোবর ১৯৫৪। অভিশপ্ত শেষ বিকেলে দেশপ্রিয় পার্কের কাছে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ও ল্যান্সডাউন রোডের সংযোগ স্থলের কাছাকাছি ট্রাম লাইন পেরোতে গিয়ে অন্যমনস্ক কবি ট্রামের তলায় চলে যান। ট্রামের ক্যাচারে আটকে যায় শরীর। ভেঙে যায় কণ্ঠ পাঁজর ও জানুর হাড়। ভাঙা পাঁজরের হাড়ের খোঁচায় থেঁতলে যায় ফুসফুস। শেষে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের পরামর্শও কাজ দেয়নি। ২২ অক্টোবর রাত ১১:৩৪এ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আধুনিক বাংলা কবিতার রাজাধিরাজ জীবনানন্দ দাশ।

বরিশালের ব্রাহ্ম পরিবারে জন্ম। বাবা সত্যানন্দ দাশগুপ্ত ছিলেন ব্রাহ্ম উপাসক , প্রাবন্ধিক , শিক্ষক। মা কুসুমকুমারী স্বভাবকবি। লিখেছেন কালজয়ী ছড়া (বিন্দু )- “আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে /কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।” প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে পুরাণ -উপনিষদের কাহিনী শুনে শুনে বড় হয়েছেন তিনি। মা শোনাতেন ব্রাহ্ম সংগীত। ব্রজমোহন স্কুল ও ব্রজমোহন কলেজ হয়ে প্রেসিডেন্সিতে ভর্তি হন। ইংরেজি অনার্সে। এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. পাস করেন (১৯২১)।
অনিশ্চিত জীবিকা আজন্ম তাড়া করেছে তাঁকে। অধ্যাপনা করেছেন সিটি কলেজ (কয়েক মাস), প্রফুল্লচন্দ্র কলেজ (বাগেরহাট , খুলনা / আড়াই মাস ), দিল্লীর রামযশ কলেজে। এরপর বিয়ে। আর দিল্লী ফিরে যাননি। পাঁচবছর কর্মহীন। গৃহশিক্ষকতা করেছেন। বিমা কম্পানির এজেন্ট হয়েছেন। ছোট ভাই এর কাছে অর্থ ঋণ নিয়ে ব্যবসা শুরু করে, ব্যর্থ হয়েছেন। বরিশালে ফিরে গিয়ে ব্রজমোহন কলেজে অধ্যাপনা করেছেন (১৯৩৫-১৯৪৮)। তবে কলকাতার টানে হৃদয় কাঁদত সমানে। ১৯৪৬ এর দাঙ্গা ,স্বাধীনতা দেশ বিভাজনে রক্তাক্ত হন কবি। সপরিবারে ফিরে এসেছেন কলকাতায়। ভাড়া বাড়িতে।
এবার ‘দৈনিক স্বরাজ’ পত্রিকার রবিবারের সাহিত্য বিভাগ সম্পাদনার চাকরি পেলেন। কিন্তু তাও সাত মাস। নজরুল সম্পর্কে নিজের একটি গদ্য লেখা এই কাগজে প্রকাশ করে কর্তৃপক্ষের বিরাগ ভাজন হলেন। বিদায় ঘন্টা বাজল। এবার খড়্গপুর কলেজ, বড়িশা কলেজ হয়ে নাড়া বাঁধলেন হাওড়া গার্লস কলেজে। এখানেই কর্মরত ছিলেন আমৃত্যু।

১৯৩০ এর ৯ মে পুরানো ঢাকার সদরঘাট সংলগ্ন রামমোহন লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত হয় কবির বিবাহ বাসর। পাত্রী — লাবণ্যপ্রভা গুপ্ত। সেই অন্যরকম ব্রাহ্ম বিবাহ অনুষ্ঠানে বরযাত্রী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দিকপাল কবি বুদ্ধদেব বসু এবং অজিত দত্ত। এই বুদ্ধদেবই জীবনানন্দের বহু কবিতা ছেপে তাঁকে প্রচারের আলোয় এনেছিলেন। সমালোচকদের নির্মম প্রচারের বিরুদ্ধে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর কবিতা পত্রিকাও জীবনানন্দের প্রতিভালোকে আলোকিত হয়েছে সে সময়। বুদ্ধদেব বসু তাঁকে নির্জনতম কবি অভিধায় ভূষিত করেছেন ।

জীবনানন্দের বাবার সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ব্রাহ্মবাদী পত্রিকা। এই পত্রিকার বৈশাখ সংখ্যায় জীবনানন্দের ‘বর্ষা আবাহন’ নামক কবিতা মুদ্রিত হয়। এটাই কবির প্রথম প্রকাশিত কবিতা। তাঁর প্রথম কাব্য গ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯২২ সালে। ঝরাপালক। এই কাব্যে নজরুল -মোহিতলাল -সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত প্রমুখের প্রভাব লক্ষ করা যায়। এরপর ধীরে ধীরে প্রকাশিত হয়েছে সাতটি তারার তিমির ,ধূসর পাণ্ডুলিপি ,বনলতা সেন। এই বনলতা সেন প্রকাশের পর নানা বিতর্ক সত্ত্বেও তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার জগতে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন ।
‘শনিবারের চিঠি’র সজনীকান্ত দাস ছিলেন তাঁর প্রবল সমালোচক। তিনি দুর্বোধ্যতার কারণেই প্রধানত তাঁকে নানা সময়ে বিদ্ধ করেছেন। কখনো বলেছেন — ‘গণ্ডারমারী কবিতা’। কখনো লিখেছেন ‘নির্জন পেঁচার মতো প্রাণ যদি অলৌকিক না হয়, তাহলে সীতার পাতাল প্রবেশও অলৌকিক নয়’। এই মানুষটিই আবার হাসপাতালে ভর্তি থাকা বিপন্ন জীবনানন্দের পাশে থেকেছেন, পরম ব্ন্ধু হয়ে। তবে কবি জীবনানন্দের সবচেয়ে বড় সমালোচক ছিলেন তিনি নিজেই। তাই সারাজীবনে সাড়ে আটশো কবিতা লিখে মাত্র ১৬২টি প্রকাশযোগ্য বলে ছাপতে দিয়েছেন।

নীরবে নানা লেখা লিখে খাতা ও ডায়েরি ট্রাংকে ভর্তি রেখে গেছেন। ‘রূপসী বাংলা’ নামে সনেট সংগ্রহ ছাপার যোগ্য কিনা দ্বিধায় থেকেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর নামহীন কবিতাগুলি কাব্যরূপে মলাটবদ্ধ হয়েছে। বোন সুচরিতা দাশ ও ব্ন্ধু ভূমেন্দ্র গুহের সৌজন্যে। কবি অবশ্য লিখে রেখে গিয়েছিলেন শিরোনাম হিসেবে– বাংলার ত্রস্ত নীলিমা। এছাড়াও ষাট -পঁয়ষট্টিটি খাতায় ‘লিটেরারি নোট’ রেখে গেছেন কবি। নানা প্রবন্ধ রচনা করেছেন সাহিত্য বিষয়ক। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধ সংকলন হল -‘কবিতার কথা’।
যে কোনো আধুনিক কবিতার নিবিষ্ট পাঠকের অবশ্য গন্তব্য এই গ্রন্থ। যার শুরু হয়েছে এইভাবে -“সকলেই কবি নয়। কেউ কেউ কবি ; কেন না তাদের হৃদয়ে কল্পনার এবং কল্পনার ভেতরে চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সারবত্তা রয়েছে, এবং তাদের পশ্চাতে অনেক বিগত শতাব্দী ধরে এবং তাদের সঙ্গে সঙ্গে আধুনিক জগতের নব নব কাব্য বিকীরণ তাদের সাহায্য করেছে। এই প্রবন্ধ রচনার প্রেরণায় ছিলেন বন্ধুবর বুদ্ধদেব বসুই। তিনি কবিতা পত্রিকার একটি বিশেষ প্রবন্ধ সংখ্যার পরিকল্পনা করেছিলেন (১৩৪৫,বৈশাখ ) যাতে গদ্য লিখেছেন সেকালের প্রমুখ কবিবর্গ।

২১টি উপন্যাস এবং ১২৬টি গল্প লিখেছেন জীবনানন্দ দাশ। সংখ্যাটা আরো বাড়তেও পারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর কবিতার প্রতি অনুরক্ত হন। বুদ্ধদেব বসুকে লেখা চিঠিতে জীবনানন্দের মূল্যায়ণ করতে গিয়ে তাঁর ‘মৃত্যৃর আগে’ কবিতাটিকে চিত্ররূপময় আখ্যা দেন। ১৯৩৮ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘বাংলা কাব্য পরিচয়’ নামে একটি কবিতা সংকলন সম্পাদনা করেন, তাতে তাঁর মৃত্যুর আগে কবিতাটি সংযোজিত হয়। এছাড়া ১৯৩৯ সালে আবু সয়ীদ আইয়ুব এবং হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রথম যে আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলন সম্পাদনা করেন, তাতে পাখিরা, শকুন ,বনলতা সেন ও নগ্ন নির্জন হাত কবিতা চারটি সংকলিত হয়।

তাঁর বনলতা সেন কাব্যগ্রন্থটি প্রথমে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবন থেকে ‘এক পয়সায় একটি’ সিরিজের অংশ হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ সালে। পরে ১৯৫২ সালে সিগনেট প্রেস থেকে তা বর্ধিত আকারে প্রকাশিত হলে বহু পাঠকের দরবারে পৌঁছে যায়। নিখিল বঙ্গ রবীন্দ্র সাহিত্য সম্মেলন রবীন্দ্র- স্মৃতি পুরস্কারে জীবনানন্দকে সম্মানিত করে বনলতা সেন কাব্যের জন্য। ১৯৫৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয় জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা। ১৯৫৫ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থটি ভারত সরকারের সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হয়।

কবির প্রয়াণের পর তাঁর জনপ্রিয়তা ধীরে ধীরে ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। এপার বাংলা -ওপার বাংলায় বহু বিশিষ্ট জীবনানন্দ অনুরাগী কবি -সাহিত্যিক -বুদ্ধিজীবী তাঁর গ্রন্থগুলিকে নানা ভাবে প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত জীবনানন্দ দাশের কাব্য সংগ্রহ (১৯৯৩)। পরে আবদুল মান্নান সৈয়দ ,ক্ষেত্র গুপ্ত ,সুকুমার ঘোষ ও সুবিনয় মুস্তাফী কাজ করেছেন। ২০০৫ সালে প্রতিক্ষণ প্রকাশনী ততদিন পর্যন্ত আবিষ্কৃত অগ্রন্থিত রচনাবলী সহ ১৪খণ্ডের সকল কবিতার সংকলন প্রকাশ করে ভূমেন্দ্র গুহের সম্পাদনায়। দীপেন কুমার রায় ও আবদুল মান্নান সৈয়দ তাঁর ১০১টি চিঠির সংকলন প্রকাশ করেছেন ।
যে ট্রামের তলায় কবি পিষ্ট হয়েছিলেন ,সেই ট্রাম আর নেই । আগুনে একসময় ভস্মীভূত হয়েছে। কোনো কোনো অনুরাগী সক্ষোভে বলেছেন -ব্যক্তি জীবনে চূড়ান্ত অসুখি মানুষটির জীবনস্পৃহা-শূন্য হয়ে যায়। পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তা, তীব্র সমালোচনা এবং মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক ভাবে মিশতে না পারা – কবির জীবনের প্রতি বীতরাগ জন্ম দেয়। এও এক জটিল অঙ্ক! অসংখ্য আশাবাদের আলোকে উদ্ভাসিত কবির নাকি জীবনের প্রতি আকর্ষণ ছিলনা। দুর্ঘটনায় পতিত হওয়ার সময় কবি তবে কেন তাঁর দুই হাতে দুই ‘কাঁদি’ ডাব বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন বাসার উদ্দেশে?

- Advertisement -
Latest news
Related news