Monday, April 15, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল— ১৭০।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশ রায়বংশের ঠাকুরবাড়ি, খোর্দা বিষ্ণুপুর
(দাসপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর) নাড়াজোল রাজবাড়ি থেকে পূর্বমুখী পথের উপরেই একটি প্রাচীন গ্রাম– সুরা নয়নপুর। এই নয়নপুর থেকে একফালি পথ গিয়েছে বাঁয়ের হাতে। সে পথের গন্তব্য গুড়লি আর সুরতপুর। রেশমশিল্পের সুবাদে, একদিন জগত বিখ্যাত হয়েছিল এ দুটি গ্রাম। কথার কথা নয়, সত্যিই সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রাম দুটির নাম। আর পড়েছিল বলেই না, বিদেশি বণিকের দল এসে ভীড় করেছিল এখানে।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

কে আসেনি? আর্মেনিয়ান, ওলন্দাজ, ফরাসি বণিকেরা এসে সামিল হয়েছিল রেশম ব্যবসাতে। তার পর তো উড়ে এসে জুড়ে বসেছিল ইংরেজ বণিকেরা। আর সবাইকে তাড়িয়ে, পুরো রেশম ব্যবসা দখল করে নিয়েছিল তারা।
গ্রাম দুটির গা বেয়ে চলেছে শিলাবতী। সেখানে পাকাপাকি ঘাট গড়েছিল ইংরেজরা। এখও সে ঘাটের নাম– ‘সাহেবঘাট’। এখনও তিনটি রেশমকুঠির ধ্বংসাবশেষ, আর ঘন গাছপালার বুক ফুঁড়ে আকাশে মাথা তোলা চিমনী, দেখা যায়, গ্রামে ঢুকলে।
বণিকদের স্টিমার এসে ভিড়ত ঘাটে। শিলাবতী থেকে গিয়ে পড়ত রূপনারায়ণের বুকে। সেখান থেকে হুগলি বা গঙ্গায়। তারপর? তারপর সাগরে পড়ে, যাও যেদিকে মন চায়। সেই যে বলে না– ‘যথা ইচ্ছা তথা যা‘। প্রকৃতই সারা বিশ্ব জুড়ে রেশমের বাণিজ্য হোত একদিন!
তো, সুরতপুরের কথা পরে কোন এক জার্ণালে বলা যাবে। আজ অন্য এক গ্রাম, এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার বাবু আর তাঁদের ঠাকুরবাড়ির কথা বলা যাক। ভারি করুণ পরিণতি হয়েছিল জমিদারবংশ আর ঠাকুরবাড়িটির।
নয়নপুর ছেড়ে, সুরতপুরের পথে যেতে যেতে, থেমে পড়তে হোল। না থেমে উপায়ই বা কী? একেবারে পথের গায়েই, এক মনমোহন ছবি। ঘন ঝোপঝাড় আর বড় বড় মহীরুহের সবুজ পর্দা ফুঁড়ে উঁকি দিচ্ছে তিনটি জীর্ণ দেউল! দাঁড়িয়ে পড়তেই হবে যে কাউকে!
কত দিনের দেউল? কে গড়েছিল দেউলগুলি? তারাই বা গেল কোথায়? চার দিক খাঁখাঁ। বহু দূর পর্যন্ত কোন জনবসতি নাই। যেন উধাও হয়ে গিয়েছে একেবারে ভোজবাজির মত।
এবার শুরু হোল, সুরতপুর আর গুড়লির প্রবীন মানুষদের খোঁজে ঘরে ঘরে ঢুঁ মারা। তাঁদের সাথে বসে ফেলে আসা করুণ কাহিনীর পাতা ওল্টানো!
প্রবীনদের বয়ান, ইতিহাসের তথ্য আর সরেজমিন সমীক্ষার উপলব্ধি—এই তিন উপাদানের মিশেলে বিবরণটি পেশ করব আমরা।
এক সময় চন্দ্রকোণা এবং দাসপুর থানা রেশমশিল্পে বিশেষ উন্নতি লাভ করেছিল। সেই সুবাদে, ধনাঢ্য হয়ে উঠেছিলেন স্থানীয় বহু পরিবার এবং ব্যক্তিবিশেষও।
তেমনই একটি ধনী বংশ ছিল খোর্দা-বিষ্ণুপুরের রায়বংশ। বেশ বড় মাপের একটি জমিদারীও ছিল এই বংশের। দেবারাধনার জন্য তিনটি মন্দির গড়েছিলেন তাঁরা। উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা হয়েছিল মন্দিরগুলিকে। একটি ফলক ছিল সেই প্রাচীরের ফটকে। তাতে উল্লেখ ছিল, বাংলা ১২৫৫ সনে (ইং ১৮৪৮ সাল) জমিদার বংশের জনৈক ডা. যদুনাথ রায় এগুলি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রাচীরের কোনও চিহ্নই নাই আজ আর। তবে, প্রায় বুজে আসা, মরা খাত থেকে দেখা যায়, একটি গড়খাইও ছিল প্রাচীরের বাইরে দিয়ে।
একটি প্রতিষ্ঠা ফলকও ছিল মন্দিরে। পুরাবিদ অধ্যাপক প্রণব রায় তাঁর মেদিনীপুরঃ  ঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃঃইতিহাস ও সংস্কৃতির বিবর্তন, ৫ম -খন্ড এ ফলকটির বিবরণও দিয়েছেন। তা থেকে জানা যায়, ১৮৪৯ সালে মন্দিরটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছিল।

এই রায়বংশের এক জমিদারের কথা বলেন গ্রামের প্রবীন অধিবাসীগণ। জমিদারবংশের একেবারে শেষ পর্বে, ভারী দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার ছিলেন তিনি। তাঁর নামটি আমরা উদ্ধার করে উঠতে পারিনি। ছোট্ট একটি উদাহরণ দিলে, জমিদাবাবুর প্রতাপটি বেশ বোঝা যাবে।
জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে, সামনে মুখ করে যাবার হিম্মত বা অধিকার ছিল না কারও। যেতে হত পিছন দিকে হেঁটে। অজানতেও কেউ হেঁটে গেলে, তাকে ধরে পিছন মুখ করে হাঁটানো হোত। তারপর কয়েদ করে রাখা হোত গুমঘরে নিয়ে গিয়ে।
বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত ছিল এই জমিদারবংশ। একটি গুরুবংশও ছিল তাঁদের। একবার গুরুদেব এসেছেন বাড়িতে। পাদ্য অর্ঘ দিয়ে, একটি সিংহাসনে বসানো হয়েছে তাঁকে। গুরুদেবের চোখ গেল জমিদারদের সারি সারি নারকেল গাছের দিকে। গুরুদেব পুলকিত কন্ঠে বলে ফেললেন—বাহ, ভারি সুন্দর ডাব ফলেছে তোমাদের!
বিনয় বা নম্রতার কণামাত্র ছিল না জমিদারবাবুর গলায়। স্বভাবশুদ্ধ রুক্ষ কন্ঠে তিনি বলে উঠেছিলেন—নারকেল গাছে নয়, অন্য দিকে দৃষ্টি দিন আপনি। বলবার সময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন, কার সাথে কথা বলছেন তখন।
তার পরের ঘটনাবলী থাক। লোকে আজও বলাবলি করে, রায়বংশের জমিদারীর পতন শুরু হয়েছিল সেদিন থেকেই। একদিন পুরো বংশটাই নাকি একেবারে ভোজবাজির মত উবে গিয়েছিল। তাঁদের কথা কারও জানা নাই তেমন।
তবে, কয়েকটি প্রাচীন নারকেল গাছ আজও আছে পোড়ো মন্দিরগুলির গায়েই। অবশ্য সেগুলি সেই জমিদারের সময়কালের কি না, সে কথা কেউ জানেন না।
সব কিছু নিয়ে গড়ে ওঠা দেবস্থলীটি “ঠাকুরবাড়ি” নামে পরিচিত হয়েছিল। একেবারে গা-লাগোয়া তিনটি মন্দির। মাঝখানে রঘুনাথ নামের বিষ্ণু মন্দির। দু’পাশে দুটি শিব মন্দির। সবগুলিই ইটের তৈরি দক্ষিণমুখী সৌধ।
শিবের মন্দির দুটি শিখর-দেউল রীতির, খিলানের এক-দ্বারী। চার দিকের দেওয়াল জুড়ে পঞ্চ-রথ বিন্যাস করা। শিখর অংশটি সম্পূর্ণ বিনষ্ট, কোন চিহ্নই নাই আর। ভিনিশীয় রীতির ‘প্রতিকৃতি-দ্বার’ ছাড়া, অন্য কোন অলঙ্করণও নাই মন্দির দুটিতে।
রঘুনাথ মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন রীতির। সামনে একটি খিলানের তিন-দুয়ারী অলিন্দ। ইমারতি রীতির থাম। অলিন্দের সিলিং হয়েছে টানা-খিলান রচনা করে।
গর্ভগৃহটিও এক-দ্বারী। তার দু’দিকে দুটি ‘প্রতিকৃতি-দ্বার। ভিতরে সিলিং হয়েছে দু’প্রস্থ খিলানের মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে। উপরে পাঁচটি রত্নেই কলিঙ্গশৈলীতে রথবিন্যাস করা। তবে, গণ্ডী অংশে পীঢ়-ভাগ করা হয়নি। শীর্ষক অংশগুলি সম্পূর্ণ অবলুপ্ত। সেগুলি আর দেখা যায় না।
সামনের দেওয়াল জোড়া অলঙ্করণ এ মন্দিরে। তিনটি দ্বারপথের মাথায়, তিনটি বড় প্রস্থে। প্রতিটিতে তিনটি করে টানা-প্যানেল। বিভিন্ন কাহিনী রূপায়িত হয়েছে মোটিফ হিসাবে। রাম-রাবণের লঙ্কাযুদ্ধ, কুম্ভকর্ণের নিদ্রাভঙ্গ, প্রার্থনারত মুনি-ঋষিগণ সহ দশভূজা দেবী দুর্গা, ব্রহ্মা-বিষ্ণু-মহেশ্বর, কমলে কামিনী আর বিষ্ণুর দশাবতার ইত্যাদি। তবে, বর্তমানে ফলকগুলি অতিশয় জীর্ণ। পরিচয় উদ্ধারে যথেষ্ট বেগ পেয়ে হয়।
বহুসংখক ছোট খোপে একক ফলক আছে এই দেওয়ালে। প্রথম কার্ণিশের নীচে দুটি সারি, দ্বিতীয় কার্ণিশের নীচে এক সারি, দুটি পূর্ণ স্তম্ভের মাথায় দুটি খাড়া সারি এবং দু’দিকের কোণাচ অংশের গায়ে দুটি খাড়া সারির ফলকে মন্দিরটি সাজানো হয়েছিল।
তিনটি মন্দিরই দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত। অবহেলা আর অনাদরে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। ধীরে ধীরে সম্পূর্ণ অব্লুপ্তির পথে চলেছে সৌধগুলি।
সাক্ষাতকারঃ সর্বশ্রী সুবল মণ্ডল, বিশ্বনাথ হাজারী, বিপ্লব হাজারী—সুরতপুর।
পথনির্দেশঃ দ. পূ. রেলপথের পাঁশকুড়া স্টেশন থেকে ঘাটালগামী রাস্তায় বকুলতলা। সেখান থেকে নাড়াজোল মুখী রাস্তায় সুরা নয়নপুর। এবার উত্তরমুখে কিমি দুয়েক দূরে, রাস্তার গায়েই মন্দিরগুলি অবস্থিত।

- Advertisement -
Latest news
Related news