Monday, April 15, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল- ১৫৫ চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশ
জয়চণ্ডী মন্দির, জয়পুর (আনন্দপুর থানা, মেদিনীপুর)কবিকঙ্কন মুকুন্দরাম চণ্ডীমঙ্গল লিখেছিলেন সতের শতকের একেবারে সূচনায়। কাজীর অত্যাচারে বর্ধমানের দামুন্যা গ্রামের বাস্তুভিটে ছেড়ে, অনেক পশ্চিমে ব্রাহ্মণভূম পরগণার আঢ়রাগড়ে পালিয়ে এসেছিলেন তিনি। রাজা বাঁকুড়া রায় আশ্রয় দিয়েছিলেন কবিকে।
বাঁকুড়া রায়ের কুলদেবী জয়চণ্ডী। দেবীর অধিষ্ঠান রাজপ্রাসাদের অদূরে জয়পুর গ্রামে। সেই মন্দিরের একটি বটবৃক্ষের তলায় বসে সাধনা করতেন মুকুন্দরাম। তিনি চণ্ডীমঙ্গল রচনা করেছিলেন বাঁকুড়া রায়ের পুত্র রঘুনাথ রায়ের সময়কালে। জয়পুর গ্রামের এই জয়চণ্ডী মন্দিরের প্রাঙ্গণেই চণ্ডীমঙ্গল প্রথম পাঠ করা হয়েছিল ।
যাক সেসকল কথা। জয়চণ্ডী মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন বাঁকুড়া রায়ের পিতামহ শ্রীধর রায়। একটি প্রতিষ্ঠা ফলক ছিল মন্দিরে। তার বয়ান অনুসারে, ১৫৪১ শকাব্দ বা ইং ১৬১৯ সালে মন্দিরটি নির্মিত হয়েছিল।
রাজা রঘুনাথ রায় বর্ধমান রাজার কাছ থেকে ‘দেব’ উপাধি পেয়েছিলেন। তখন থেকে এই বংশ দেব পদবীতেই পরিচিত হয়ে আছেন। প্রথমে বর্গী আক্রমণের কারণে, পরে ইংরেজ শাসকদের অত্যাচারে, দেববংশ আঢ়রাগড় ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিল। একাধিক বার বিভিন্ন বাসভুমি বদল করে, কেশপুর থানার গড়সেনাপত্যা গ্রামে স্থায়ী অধিবাসী হয়ে আছে বংশটি। সেখানে কুলদেবী দুর্গার অষ্টাদশভূজা মূর্তিতে আরাধনা করেন তাঁরা। কিন্তু জয়চণ্ডীর এই মন্দিরে পূজা নৈবেদ্য পাঠিয়ে, তবেই পূজা শুরু হয় সেখানে।
বিভিন্ন এলাকায় অস্থিরভাবে ছুটে বেড়াতে হলেও, দীর্ঘকাল এই মন্দির এবং দেবীর সেবাইত বহাল ছিল দেববংশ। তবে, সাম্প্রতিক অতীত থেকে দেখা যায়, জয়পুরের গ্রামবাসীগণই দেবীর সেবাপূজা এবং মন্দির সংরক্ষণের সমূহ দায়দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
বেশ কয়েকবার সংস্কার হয়েছে মন্দিরটির। দ্বিতীয় বার সংস্কার হয় ১৮৩০ সালে। সাবেক মন্দিরের দেওয়ালে পাথরে খোদাই একটি সংস্কার-লিপি ছিল। তার হুবহু বয়ান– “সকাব ১৭৫১ / শ্রীশ্রী জয়চণ্ডী মা / শ্রী নিত্যানন্দ সিংহ / সন ১২৩৭ সাল /তাং ২ মাঘ মাষ”। অর্থাৎ ইং ১৮৩০ সালে জনৈক নিত্যানন্দ সিংহ মন্দিরের সংস্কার করেছিলেন।
এই সংস্কারক সম্পর্কে দু’-একটি কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। বড়লাট লর্ড কর্ণওয়ালিশ ইং ১৭৯৩ সালে ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা’ প্রচলনের পর, রাঢ়বাংলার দক্ষিণ এলাকা জুড়ে ভয়ংকর ‘চুয়াড় বিদ্রোহ’-এর সূচনা হয়। মেদিনীপুর পরগণার কর্ণগড়ের রানি শিরোমণি দেবীর পৃষ্ঠপোষকতা আর গোবর্ধন দিকপতি নামে এক বিদ্রোহী তালুকদার (ছোট জমিদার)-এর নেতৃত্বে দাবানলের মত জ্বলে উঠেছিল বিদ্রোহটি।
ভঞ্জভূম (মেদিনীপুর) আর ব্রাহ্মণভূম পরগণায় বিদ্রোহ দমনের নায়ক ছিলেন এক কুখ্যাত বাঙালি দারোগা। তিনিই হলেন নিত্যানন্দ সিংহ। নির্বিচারে শত শত বিদ্রোহীকে হত্যা করেছিলেন এই দারোগা। এক রাত্রিতেই হত্যা করেছিলেন ৭০০ বিদ্রোহীকে। পরে, বিদ্রোহীদের জায়গীর জমি দখল করে, নিজেই জমিদার হয়ে বসেছিলেন দারোগাবাবু। (‘মেমোরাণ্ডা অব মিডনাপোর’ / এইচ ভি বেইলি, ‘হিস্টোরী অব মিডনাপুর’ / নরেন্দ্র নাথ দাস, কিংবা মেদিনীপুর ফোর্ট-এর কম্যান্ডার মি. গ্রেগরী-র এক পত্র থেকে এ সম্পর্কে বিশদ তথ্য পাওয়া যাবে।)
পার্শ্ববর্তী গ্রাম শ্যামচাঁদপুর থেকে পাওয়া, ১টি ‘ভূমিদান পাট্টা’ থেকে জানা যায়, উপরোক্ত গোবর্ধন দিকপতি জয়চণ্ডী দেবীর সেবাপূজার জন্য, সন ১১৬২ সালে, ৮ বিঘা সম্পত্তি দেবোত্তর করেছিলেন।
যাইহোক, জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে, ইং ১৮৩১ সালে, জয়পুরের অদূরে শ্যামচাঁদপুরে দুটি মন্দির গড়েছিলেন নিত্যানন্দ— দালান-রীতিতে নিজের রামসীতা মন্দির। এবং চক্রবর্তী বংশের জন্য পঞ্চরত্ন রীতির শ্যামচাঁদ মন্দির। ঐ সময়কালেই তিনি জয়পুরের এই আলোচ্য মন্দিরের সংস্কারও করে দিয়েছিলেন।
মাকড়া পাথরের দক্ষিণ্মুখী মন্দির। একাধিক সংস্কার কাজের কারণে, মন্দিরের অবয়বে গুরুতর পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। সেকারণে, পূর্বের মন্দির কাঠামোর প্রায় কিছুই আর দেখা যায় না।
পূর্ববর্তী পুরা গবেষকগণের বিবরণ থেকে জানা যায়, আদি মন্দিরটি চার-চালা রীতিতে নির্মিত ছিল। বর্তমানে দেখা যায়, মন্দিরটি পঞ্চ-রত্ন হিসাবে রূপান্তরিত করে নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি রত্ন ষড়ভূজাকৃতি। মন্দিরকে চারদিক ঘিরে প্রশস্ত প্রদক্ষিণ-পথ রচিত হয়েছে। সামনে বড় মাপের উন্মুক্ত নাটমন্দির।
গর্ভগৃহটি সামান্য নীচু, বর্গাকার। দৈর্ঘ্য-প্রস্থ সওয়া ৯ ফুট হিসাবে। গর্ভগৃহের ভিতরে, উত্তরের মাকড়া পাথরের দেওয়ালে দশভূজা দুর্গার মহিষমর্দিনী মূর্তি। মূর্তিটি বা-রিলিফ রীতিতে খোদাই করা। দক্ষিণ ছাড়া, গর্ভগৃহে পশ্চিমেও একটি অতিরিক্ত দ্বার আছে।
দেবীকে পশুবলি উৎসর্গ করবার রীতি আছে। কিন্তু রান্নাতে পেঁয়াজ-রসুন, এমনকি আদাও ব্যবহার ক্রার রীতি নাই। এখানে টেরাকোটার ছলন নিবেদন করবার চল আছে। বিপুল ভক্ত সমাগম হয় মন্দিরে।
সাক্ষাৎকার ঃ সর্বশ্রী গৌরহরি ঘোষ, অসিত ঘোষ, বিশ্বজিৎ মাইতি—রলাপাট। ক্ষুদিরাম মহাপাত্র, কৃষাণ দাস—জয়পুর। উদয় শঙ্কর মল্লিক, রণজিৎ ব্যানার্জী—পুরোহিতগণ।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

ঃ মেদিনীপুর-বাঁকুড়া রাস্তায় মণ্ডল্কুপি থেকে মোটরেবল রাস্তায় কিমি পাঁচেক দূরে জয়পুর। এই পথে সবরকম ছোট গাড়ি চলাচল করে। পূর্বদিক থেকে এলে, কেশপুর, আনন্দপুর হয়েও পৌঁছানো যাবে।

- Advertisement -
Latest news
Related news