Saturday, May 25, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-১৩৭ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্নাল-১৩৭
                       চিন্ময় দাশশিব ও শীতলা মন্দির, পাথরা (কোতওয়ালি, মেদিনীপুর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

কোনও প্রতিষ্ঠা-ফলক নাই মন্দিরে। সেবাইতবংশ থেকে জানা যায়, পাথরার জমিদার জনৈক শীতল নারায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় শিব এবং শীতলার দুটি মন্দির গড়েছিলেন। অষ্টাদশ শতকের কোনও এক সময়ে। শীতলার মন্দিরটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। শিবের মন্দিরটি টিকে আছে কোনও রকমে।
বন্দ্যোপাধ্যায় বংশ পাথরার আদি জমিদার নন। দৌহিত্রসূত্রে জমিদারির অংশ পেয়ে এখানে এসে বসতি করেছিলেন তাঁরা। পাথরার জমিদারি আর বন্দ্যোপাধ্যায় বংশ বিষয়ে জানতে গেলে, মেদিনীপুর জেলার ইতিহাসের অনেকগুলি পাতা উল্টে দেখতে হবে আমাদের।
আজকের কলকাতার এড়িয়াদহের বাসিন্দা, নবাব আলীবর্দী খাঁ-র দেওয়ান, জনৈক বিদ্যানন্দ ঘোষাল পাথরা গ্রামে এসে জমিদারী প্রতিষ্ঠা করে বসবাস করতেন। বিদ্যানন্দের কনিষ্ঠ পৌত্র কৃষ্ণদেব ছিলেন অপুত্রক। তাঁর একমাত্র কন্যার বিবাহ হয় হাওড়া জেলায় বালির চট্টোপাধ্যায় বংশের জনৈক রামচরণ-এর সাথে। রামচরণের কনিষ্ঠ পুত্র সীতারামের কন্যা সাইমণির বিবাহ হয়েছিল জনৈক রামসুন্দর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর সাথে। এই রামসুন্দর এবং সাইমণির ৪ পুত্র, দৌহিত্র হিসাবে, পাথরার জমিদারির অংশ পেয়েছিলেন।

রামসুন্দরের এক পৌত্র করালী চরণ। তাঁর কনিষ্ঠ পৌত্র ছিলেন শীতল নারায়ণ। পিতার মৃত্যুর পর, তিনি যখন সম্পত্তির অংশ পেলেন, সেটি নামেই জমিদারি। আসলে একটুখানি খন্ড অংশ মাত্র। পাথরা লাগোয়া ছোট্ট একটি মৌজা বিন্দা পাথরা। সেটিই জুটেছিল তাঁর ভাগে।
বিদ্যানন্দ ঘোষাল বা মজুমদার থেকে শুরু করে, চট্টোপাধ্যায় এবং বন্দ্যোপাধ্যায় বংশের অনেক জমিদারই ততদিনে অনেকগুলি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছেন পাথরা এবং লাগোয়া গ্রামগুলিতে। সামান্য সম্পত্তি পেলেও, দেবালয় প্রতিষ্ঠার ধারা থেকে দূরে থাকেননি শীতল নারায়ণ। বিখ্যাত কলাইচন্ডী খাল যেখানে কাঁসাই নদীর সাথে মিলিত হয়েছে, সেই মোহনা ছুঁয়ে বিন্দা পাথরা মৌজা। সেখানেই শিব এবং শীতলা– দুই দেব-দেবীর দুটি মন্দির গড়েছিলেন তিনি। মন্দিরময় গ্রাম পাথরায় প্রবেশের মুখে, প্রথম দেবস্থান এইটি। বিন্দা পাথরা গ্রামেরই ভট্টাচার্য্য পদবীর একটি ব্রাহ্মণবংশ এখানে পৌরহিত্য করে চলেছেন। এই বংশের আদি কথাটি বিশদে বলা আবশ্যক।

মেদিনীপুর জেলায় দুই পন্ডিত খ্যাতিমান, যাঁরা ” বিদ্যালঙ্কার ” উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। প্রথম জন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। বিদ্যাসাগর মশাইর পূর্বে তিনি জন্মেছিলেন। ওডিশা রাজ্যের গা-লাগোয়া ভেটিয়া (দাঁতন থানা) গ্রামে। তবে তাঁর ভাষা চর্চা মহানগর কোলকাতাতে।
অন্যজন হলেন জনৈক রাধাশ্যাম বিদ্যালঙ্কার। আদি নিবাস হুগলি জেলায় খানাকুল এলাকার কৃষ্ণনগর গ্রামে। পরিবারের আদি পদবী ছিল ‘মুখোপাধ্যায়’। সংস্কৃত ভাষায় বিশেষ পান্ডিত্যের জন্য, ” ভট্টাচার্য্য ” উপাধি পেয়েছিল পরিবারটি। তখন থেকে এই বংশ “ভট্টাচার্য্য” পদবীতে পরিচিত হয়ে আছেন। সংস্কৃতবেত্তা হিসাবে, রাধাশ্যাম-এর বংশে আরও যাঁরা উপাধি পেয়েছিলেন– ছোট্ট একটি তালিকা দিলে, এই বংশের পান্ডিত্বের ছবিটি অনুধাবনে সুবিধা হবে।


রাধাশ্যাম-এর ১. প্রপিতামহ ছিলেন– নিধিরাম ‘তর্কালঙ্কার’। ২. পিতামহ– কার্তিকরাম ‘তর্কবিশারদ’। ৩. পিতা– রাজারাম ‘ন্যায়ভূষণ’। ৪. কার্তিকরাম-এর সহোদর ভাই– কাশীরাম ‘বিদ্যাবাগীশ’। রাধাশ্যাম-এর দুই সহোদর ভাই– ৫. রমানাথ ‘তর্কপঞ্চাশ’, এবং ৬. ত্রৈলোক্য ‘বিদ্যানিধি’।
এই তিন সহোদর ভাইয়ের পুত্রগণও কৃতবিদ্য ছিলেন। রাধাশ্যাম-এ জ্যেষ্ঠ পুত্র ছিলেন– ৭. শৈলজা চরণ ‘ন্যায়ভূষণ’। কনিষ্ঠ পুত্র– ৮. শরৎচন্দ্র ‘ব্যাকরণতীর্থ’। ৮. রমানাথ-এর পুত্র– উপেন্দ্র ‘কাব্যপুরাণ পঞ্চতীর্থ’। ত্রৈলোক্য-এর পুত্র– ৯. মহেন্দ্র ‘বিদ্যাভূষণ’ এবং পৌত্র– ১০. সুবোধ ‘বিদ্যারত্ন’। এমনই রত্নগর্ভা ছিল রাধাশ্যাম-এর বংশ। সংস্কৃত চর্চায় উজ্বল জ্যোতিষ্কমন্ডলীর উদয় হয়েছিল এই বংশে।
পৌনে দু’শ বছর আগের কথা। ইংরেজ শাসনের সুবাদে, মেদিনীপুর নগরী তখন শিক্ষা-সংস্কৃতির চর্চায়, ব্যবসা-বাণিজ্যে দ্রুত বিকশিত হয়ে উঠছে। উন্নতি ঘটছে যাতায়াত ব্যবস্থারও। পূর্বকাল থেকে কয়েকজন জমিদারের বাস ছিল এই নগরীতে। গ্রাম এলাকার জমিদাররাও এখানে এসে বসতি গড়ে তুলছেন তখন। এই পটভূমিকায়, রাধাশ্যাম তর্কালঙ্কার নিজের ভদ্রাসন ছেড়ে, হুগলি থেকে মেদিনীপুর চলে আসেন।


যতদূর জানা যায়, বড় পরিসরে সংস্কৃত চর্চার বাসনা নিয়ে মেদিনীপুর এসেছিলেন রাধাশ্যাম। কিন্তু শহরে তখন ছোট-বড় বেশ কয়েকটি টোল প্রতিষ্ঠিত ছিল। কয়েকজন রাজা-জমিদারের পৃষ্ঠপোষকতায় চলত টোলগুলি। বিখ্যাত একটি টোল ছিল ‘ মাণিক্যরাম চতুস্পাঠী’। নাড়াজোল রাজার দেওয়া সম্পত্তিতে গড়ে উঠেছিল এই শিক্ষাকেন্দ্রটি।
পাথরার জমিদারদের খ্যাতি আর গৌরব তখন মধ্যগগণে। শহরের মায়া ত্যাগ করে, পাথরা চলে আসেন রাধাশ্যাম। বিন্দা পাথরা গ্রামে বসবাস শুরু করেন। জানা যায়, একটি টোল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। রাধাশ্যামের পান্ডিত্যের কথা জেনে, জেলার কয়েকজন জমিদার অর্থ এবং সম্পত্তি দান করেছিলেন। তার ফলে, ৪০০ থেকে ৫০০ ছাত্র নিয়ে, বিশাল আকারের একটি আবাসিক সংস্কৃত শিক্ষা কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। সুদূর দাক্ষিণাত্য থেকেও ছাত্ররা আসত এই প্রতিষ্ঠানে।
এহেন রাধাশ্যামের কনিষ্ঠ পুত্র শরৎচন্দ্র কিছুকাল কাশীধামে অবস্থান করতেন। কাশী থেকে ফিরে এলে, শরৎচন্দ্রের হাতে জমিদাররা শিব এবং শীতলার পূজার দায়ভার তুলে দিয়েছিলেন। তখন থেকে আজও, ভট্টাচায্যরাই মন্দিরে এই দুই দেবতার পূজার ভার বহন করে চলেছেন।
শিব এবং শীতলা– দুই দেব দেবীর জন্য নির্মিত হয়েছিল দুটি পৃথক মন্দির। পূর্বে শিব, পশ্চিমে শীতলা। শীতলার মন্দিরটি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। দেবীর বিগ্রহ শিবের মন্দিরে থেকে পূজিত হচ্ছেন।
দুটি মন্দিরই ইটের তৈরী, আট-চালা রীতির। নির্মিত হয়েছিল দক্ষিণমুখী করে। নদীতীরবর্তী পলিমাটি সমৃদ্ধ হওয়ার কারণে, মন্দিরের ভিত্তিবেদীর প্রায় সম্পূর্ণ অংশই ইতিমধ্যে ভূমিগত হয়ে গিয়েছে। কেবল পাদপীঠ অংশটি টিকে আছে। তবে বর্তমানে ভারী জীর্ণ দশা তার।
কোন অলিন্দ নাই মন্দিরে। সরাসরি গর্ভগৃহে প্রবেশ। দ্বারপথটি খিলান-রীতির। তবে, একটু বৈশিষ্ট দেখা যায়– মন্দিরের সামনের দেওয়ালের উপর একটি ‘প্রতিকৃতি জগমোহন’ গড়ে, তার উপরেই দ্বারপথটি রচিত হয়েছে। গর্ভগৃহের সিলিং হয়েছে চার দেওয়ালে চারটি পাশ-খিলান নির্মাণ করে, মাথায় গম্বুজ স্থাপন করে।
মন্দিরের বাইরের গড়ন বা ছাউনি উত্তল আকারের। হস্তীপৃষ্ঠের মত উঁচু। তবে, ছাউনির নিচের প্রান্ত বা কার্নিশ অংশের বঙ্কিমভাবটি বেশ মনোরম। সুন্দরী রমণীর আয়ত আঁখিপল্লব যেন। একেবারে উপরে, শীর্ষক অংশে, ক্রমান্বয়ে বেঁকি, আমলক, কলস এবং ত্রিশূল-দণ্ড স্থাপিত।
কোনও অলংকরণ নাই। তবে, সামনের দেওয়ালে চুন-বালির স্ট্যাকোর কিছু কাজ ছিল, কয়েক বার সংস্কারের পরেও, কেবল তার কিছু চিহ্ন আজও অবশিষ্ট আছে।
পূর্বেই বলেছি, শীতলার মন্দিরটির কোনও অস্তিত্ব নাই আর। তবে, সামান্য একটু ভাঙা দেওয়াল, থামের একটু অংশ, বা শীতলা মনসা দুই দেবীর ঘটের বেদীর চিহ্ন ইত্যাদি দেখা যায়।
একটি সংবাদ জানিয়ে, শেষ করি। আমেরিকা প্রবাসী জনৈক সেবাইত শিবের জীর্ণ মন্দিরের সংস্কার এবং শীতলার মন্দিরটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছেন।
সাক্ষাৎকার : সর্বশ্রী দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়, সুব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়– বেড়বল্লভপুর, মেদিনীপুর শহর। সুধাংশু শেখর ভট্টাচার্য্য, প্রভাস ভট্টাচার্য্য– পাথরা।
পথ-নির্দেশ : মেদিনীপুর শহর থেকে পূর্বমুখে, কাঁসাই নদীর উত্তর তীর বরাবর পাকা রাস্তায়, ৮ কিমি দূরে পাথরা। পাথরা ঢোকার মুখেই কলাইচন্ডী খাল। খালের সেতু পার হলেই বাম হাতে মন্দির। পুরোটাই মোটোরেবল পথ।

- Advertisement -
Latest news
Related news