Sunday, April 14, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল— ১৭২।। চিন্ময় দাস

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল চিন্ময় দাশ
লালজীউ মন্দির, অযোধ্যা                         (চন্দ্রকোণা, পশ্চিম মেদিনীপুর) চেতুয়া-বরদা পরগণায় একজন রাজা ছিলেন, তাঁর নাম শোভা সিংহ। ঐতিহাসিকেরা তাঁকে ‘বাংলার শিবাজী’ নামে অভিহিত করেছিলেন। শোভা একবার বিদ্রোহী হয়ে, বর্ধমানরাজ কৃষ্ণরামকে আক্রমণ ও হত্যা করেছিলেন। সেই যুদ্ধে তাঁর একজন সহযোগী ছিলেন চন্দ্রকোণার রাজা রঘুনাথ সিংহ।
পরে, কৃষ্ণরামের পৌত্র কীর্তিচন্দ্র চন্দ্রকোণা আক্রমণ করে, রঘুনাথকে হত্যা এবং তাঁর রাজ্য দখল করে নিয়েছিলেন। সেই ভয়াণক যুদ্ধে কামানের গোলায়, চন্দ্রকোণার বহু প্রাচীন দেবমন্দির ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য পরে কীর্তিচন্দ্র অনেকগুলি মন্দির নতুন করে নির্মাণ করে দিয়েছিলেন।
বহুল প্রচারিত একটি লোকশ্রুতি শোনা যায়, কীর্তিচন্দ্রের মন্দির নির্মাণ সম্পর্কে। যুদ্ধশেষে কীর্তিচন্দ্র যখন বর্ধমানে ফিরে যাচ্ছেন, ভেঙে যাওয়া মন্দিরগুলি থেকে অনেকগুলি বিগ্রহ সাথে নিয়ে যাচ্ছিলেন, রাজধানিতে প্রতিষ্ঠা করবেন বলে। পথে রাজা যখন শিবিরে রাত্রিবাস করছেন, দেবতা তাঁকে স্বপ্নাদেশে জানিয়েছিলেন, তিনি বর্ধমানে যেতে ইচ্ছুক নন। রাজা যেন তাঁকে চন্দ্রকোণাতেই স্থাপনের ব্যবস্থা করেন।
স্বপ্নাদেশ শিরোধার্য করে, অনেকগুলি বিশালাকার মন্দির সহ, একটি ‘ঠাকুরবাড়ি’ গড়েছিলেন কীর্তিচন্দ্র। চন্দ্রকোণা নগরীর পশ্চিম প্রান্তে ‘অযোধ্যা’ নামে একটি গ্রাম পত্তন করেছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়িটি গড়েছিলেন সেই অযোধ্যাতেই। রঘুনাথ, লালজীউ, শিব প্রমুখ দেবতার জন্য পৃথক পৃথক মন্দির ছিল সেই ঠাকুরবাড়িতে। সময়টা তখন অষ্টাদশ শতকের একেবারে গোড়ার দিক।
অতীতে চৌহান বংশীয় রাজাদের শাসনকালে, চন্দ্রকোণায় রামগড় ও লালগড় নামে দুটি প্রাচীন দুর্গ ছিল। রামগড় দুর্গে রঘুনাথ স্থাপিত ছিলেন। গিরিধারী নামিত শ্রীকৃষ্ণের বিগ্রহ স্থাপিত ছিল লালগড় দুর্গে, একটি নব-রত্ন মন্দিরে। কীর্তিচন্দ্রের কামানের গোলায়, মন্দিরাদি সহ দুর্গ দুটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
নতুন ঠাকুরবাড়িতে একটি শিখর মন্দিরে রঘুনাথজীউকে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সেই মন্দিরের পাশেই পৃথক একটি মন্দিরে গিরিধারীজীউ প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু অযোধ্যা ঠাকুরবাড়িতে প্রতিষ্ঠার সময় থেকে, গিরিধারীজীউর বিগ্রহটি “লালজীউ” নামে অভিহিত হয়ে আসছে।
সওয়া তিনশ’ বছর বড় কম সময় নয়। সর্বোপরি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, জমিদারী প্রথার উচ্ছেদ হয়ে গেলে, ঠাকুরবাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে সঙ্কটের সূচনা হয়। তার পর, বিগত সাত দশকের বেশি সময়কালে একেবারে ধ্বংসলীলা ঘটে গিয়েছে ঠাকুরবাড়িতে। তিনটি মন্দির ছাড়াও, ঠাকুরবাড়ির চোহদ্দির ভিতরে ছিল— শিবের মন্দির, বিশাল আকারের একটি নাট্মন্দির, পাকশালা, দেবতার স্নানবেদী, একটি তোষাখানা, রাসমঞ্চ ইত্যাদি কত কিছু। বর্তমানে সবগুলিরই কেবল ধ্বংসস্তুপই দেখা যায় কেবল।
কানাইলাল দীর্ঘাঙ্গী মহাশয়ের ‘ভগ্ন দেউলের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, লালজীর মন্দিরে লালজীউ, মূরলীধর, মদনমোহন, কয়েকটি রাধারানি, ললিতা ও বিশাখা দুই সখী, কয়েকটি গোপাল, গরুড় এবং চারটি শালগ্রাম শিলা প্রতিষ্ঠিত ছিল। মন্দিরটি পরিত্যক্ত হওয়ায়, বিগ্রহগুলি বর্তমানে চন্দ্রকোণার ঠাকুরবাড়ি বাজারের মাসীবাড়ির মন্দিরে অধিষ্ঠিত থেকে পূজিত হচ্ছেন।
মাকড়া পাথরে তৈরি লালজীউর মন্দিরটি ছিল দক্ষিণমুখী। ঠাকুরবাড়ির একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত ছিল এটি। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা আকারে আট-চালা রীতির বিশাল মন্দির। এটি ছিল কীর্তিচন্দ্রের অন্যতম রাজকীয় কীর্তি।
উঁচু পাদপীঠ। সামনে দরুণ-রীতির খিলানের তিন-দ্বারী অলিন্দ। থামগুলি ছিল ইমারতি-রীতির।
পূর্ববর্তী পুরাবিদ অধ্যাপক প্রণব রায়ের বিবরণ থেকে জানা যায়, গর্ভগৃহের দু’দিকে দুটি পৃথক কক্ষ ছিল। গর্ভগৃহের অভ্যন্তরে, উত্তরের দেওয়াল সংলগ্ন করে, স্বতন্ত্র একটি চার-চালা নির্মিত ছিল দেবতাদের অধিষ্ঠানের জন্য।
উত্তর সীমানার বাইরে গেলে দেখা যায়, মন্দিরের পিছনের দেওয়ালটির কিছু অংশ টিকে আছে এখনও। সেখানে ৩টি ‘প্রতিকৃতি শীর্ষক’রচিত আছে। ‘বা-রিলিফ রীতি’র আমলক, কলস, এবং পদ্ম রচিত হয়েছিল তাতে।
মন্দিরে অলঙ্করণের কাজ হয়েছিল পাথরের দেওয়াল খোদাই করে, তার উপর পঙ্খের প্রলেপ দিয়ে। মুখ্যত পৌরাণিক দেবদেবী নির্ভর মোটিফ। জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা, ষড়ভূজ গৌরাঙ্গ ইত্যাদিরও সন্নিবেশ ছিল মন্দিরে।
লালজীউর মন্দির ছাড়াও, নাট্মন্দির, পাকশালা, পুষ্যাভিষেক মঞ্চ বা দেবতার স্নানবেদী, একটি তোষাখানা, রাসমঞ্চ ইত্যাদির খণ্ডহরও রয়েছে সামনের প্রাঙ্গনে।
কিন্তু সম্পূর্ণ এলাকাটাই ঝোপঝাড়, পাথরের স্তুপ, বিষধর সরিসৃপের আস্তানায় ভরা। সেসকল অতিক্রম করে নিবিড় সমীক্ষার কাজ বেশ দুরুহই। তবে, পাশের রঘুনাথ মন্দিরটিতে এখনও যেটুকু শিল্পকর্ম টিকে আছে, তার উৎকর্ষতা দেখে, বিস্ময়ে মুগ্ধ হতে হয়।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী রামকৃষ্ণ ব্যানার্জী, গণেশ দাস—চন্দ্রকোনা।
সমীক্ষাসঙ্গীঃ শ্রী সুগত পাইন, বিশিষ্ট গবেষক ও প্রাবন্ধিক—দাসপুর।
পথনির্দেশঃ মেদিনীপুর শহর, পাঁশকুড়া স্টেশন, চন্দ্রকোণা রোড স্টেশন কিংবা আরামবাগ—সব দিক থেকে চন্দ্রকোণা আসা যায়। সেখানে নতুন বাসস্ট্যাণ্ড থেকে টোটো নিয়ে, অযোধ্যা পল্লীতে রঘুনাথ ঠাকুরবাড়ির ভিতরে মন্দিরটি অবস্থিত।

- Advertisement -
Latest news
Related news