Saturday, May 25, 2024

Kharagpur Temple: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল-১২৭: চিন্ময় দাশ     

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
                           চিন্ময় দাশ      রূপেশ্বর শিব মন্দির, খরিদা (খড়গপুর শহর)  দ্বাদশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যভাগ। দীর্ঘ সাড়ে চারশ’ বছর কলিঙ্গের রাজারা মেদিনীপুর শাসন করেছেন। সেসময় ওডিশা রাজ্য থেকে সীমান্তবর্তী জেলা মেদিনীপুরে চলে এসেছিলেন বহু রাজপুরুষ, ব্রাহ্মণ-পুরোহিত, সেনাবাহিনীর লোক-লস্কর, বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন বৃত্তির লোকজন। তাঁদের সাথে এসেছিলেন বণিক সম্প্রদায়ের লোকেরাও।

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

গুয়া-পান-হরিতকী-পাপড়ী খয়েরের ব্যবসা ছিল তাম্বুলী জাতিভুক্ত জনৈক ভিখারী রক্ষিতের। অন্যান্য অনেকের মতো, তিনিও মেদিনীপুরে চলে এসেছিলেন ব্যবসার উন্নতির ভাবনা নিয়ে। পুরী রাস্তা ধরে এই জেলার কুতুবপুর পরগণার মলিঘাটিতে এসে বসবাস শুরু করেন।
কিছুকাল পরে, ইংরেজের হাতে কাঁসাই নদীর জলপথে সরাসরি কলকাতার সাথে যোগাযগ ব্যবস্থা গড়ে উঠল। তখন ভিখারীর পুত্র দাতারাম মলিঘাটি ছেড়ে, মেদিনীপুর নগরীতে চলে আসেন। দাতারামের পুত্র ছিলেন স্বনামধন্য জন্মেঞ্জয় রক্ষিত। ব্যবসা ফুলে ফেঁপে উঠেছিল তাঁর হাতে। মা লক্ষ্মী দু’হাত উপুড় করে দিয়েছিলেন তাঁর এই সন্তানের মাথায়।

জন্মেঞ্জয় জানতেন, লক্ষ্মী যতই সদয় হোন, তিনি চিরকালই চঞ্চলা। তাঁকে বেঁধে রাখতে হয়। ইংরেজের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা’র সুবাদে, বড় মাপের একটি জমিদারী গড়ে তুলেছিলেন জন্মেঞ্জয়। মেদিনীপুর ছাড়াও, ঘাটাল, সবং, কুলদা, পিংলা, ধনেশ্বরপুর, পাঁশকুড়া, খড়গপুর, জকপুর, মাদপুর—বেশ বড়ই ছিল তাঁর জমিদারী মহাল।

বসতবাড়ি তৈরির জন্য, মেদিনীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে, পতিতাপল্লী সহ একটি বস্তি উচ্ছেদ করে দিলেন আগুন লাগিয়ে। বিশাল অট্টালিকা, তার ভিতরে দুটি মন্দির, বাইরে পঁচিশ-চুড়া রাসমঞ্চ, গুণে গুণে বারোটি শিবমন্দির, তোপ দাগবার জন্য কামান—কতকিছুই গড়ে তুললেন।
ইংরেজ সরকার থেকে ‘চৌধুরী’ এবং ‘মল্লিক’ খেতাব পেয়েছিলেন সুশাসক জন্মেঞ্জয়। তখন থকে তাঁর বংশ ‘মল্লিক’ খেতাবকে পদবী হিসাবে ব্যবহার করে আসছে।
মেদিনীপুর শহরের আজকের শিববাজার এবং মল্লিক চক নাম দুটির উদ্ভব হয়েছিল জন্মেঞ্জয়ের ১২টি শিবালয় এবং অট্টালিকার সুবাদে।
কেবল প্রাসাদের সাথেই মন্দির গড়েননি জন্মেঞ্জয়। মেদিনীপুর শহরের বর্তমান জগন্নাথ মন্দিরটিও তাঁরই তৎপরতায় নির্মিত হয়েছিল। নিজের প্রজাদের ধর্মাচরণের জন্যও, মহালের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই জমিদার। পিংলা থানার মধ্যবাড়, করকাই গ্রামের দুটি মন্দির। তার ভিতর কারুকাজ করা লক্ষ্মীবরাহ মন্দিরটি গর্ব করবার মত। চোখ মেলে চেয়ে থাকবার মত একটি মন্দির গড়েছিলেন খড়গপুরের খরিদা পল্লীতে। যতগুলি মন্দির গড়েছিলেন জন্মেঞ্জয়, খরিদার মন্দিরটি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

মেদিনীপুর শহরের মন্দিরগুলি রত্ন এবং চালা-রীতির। করকাই গ্রামের একটি মন্দির গড়েছিলেন দালান-রীতিতে। অন্যটি এবং মধ্যবাড়ের মন্দির—দুটিই রত্ন-রীতির।

কিন্তু খরিদার মন্দিরটি শিখর-দেউল রীতির। তাঁর পূর্বপুরুষ ভিখারী রক্ষিত এসেছিলেন ওডিশা থেকে। ওডিশী প্রভাবে, জন্মেঞ্জয় তাঁর মনের মাধুরী মিশিয়ে গড়েছিলেন খরিদার মন্দিরটিকে।
দিনের উদিত সূর্যের প্রথম আলোকরেখাতি এসে যাতে দেবতার চরণে পতিত হতে পারে, সেই মানসে, সামনে অনেকখানি উন্মুক্ত প্রান্তর রেখে, পূর্বমুখী করে গড়েছিলেন মন্দিরটি।
একটি আদর্শ শিখর দেউল রীতির মন্দিরের পাঁচটি অংশ—একেবারে সামনে থেকে ভোগমণ্ডপ, নাটমন্দির, জগমোহন, অন্তরাল এবং সবশেষে বিমান বা মূল মন্দির। পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির এই রীতিতে নির্মিত। মেদিনীপুর জেলায় হাতে গোণা দু-একটি শিখর মন্দিরে এই পাঁচটি অংশ দেখা যায়। নয়াগ্রাম থানার দেউলবাড় গ্রামের রামেশ্বর শিব মন্দির, ডেবরা থানার চণ্ডীপুর গ্রামের কেদারেশ্বর শিব মন্দির তার অন্যতম।
যাইহোক, খরিদার মন্দিরে তিনটি সৌধ—১ সামনে রথ বিভাজন করা জগমোহনটি একেবারে ওডিশী ধারায়, পীঢ়-রীতিতে নির্মিত হয়েছে। পিছনের বিমান সৌধটি শিখর রীতির। সেটিরও সর্বাঙ্গ জুড়ে সপ্ত-রথ বিভাজন করা।
বিমান, অন্তরাল এবং জগমোহন—তিনটি সৌধের ম্থাতেই সুদৃশ্য আমলক, কলস এবং ত্রিশূলদণ্ড রচিত আছে। তিনটিরই ভিতরের ছাদ বা সিলিং গড়া হয়েছে লহরা পদ্ধতিতে। দ্বারপথগুলি খিলান-রীতির।
পরবর্তীকালে একটি নাটমন্দির এবং সামনে একটি দুর্গা মন্দির নির্মিত হয়েছে এখান।
তেমন কোনও অলঙ্করণ নাই মন্দিরে। তবে,– ১. রথপগগুলি জোড়া জোড়া রেখায় বিন্যস্ত। ২. বিমান সৌধের চার দিকের রাহাপাগ অংশের উপর চারটি ঝাপ্পা- সিংহ রচিত হয়েছে। ৩. জগমোহন সৌধের তিন দিকের তিনটি দ্বারপথের উপর ‘প্রতিকৃতি মন্দির’ স্থাপিত।

নীল আকাশে শ্বেত-শুভ্র ডানা মেলা মরালের মত সৌন্দর্য এই মন্দিরের। এমন অপরূপ রূপের অধিকারী যে মন্দির, তার দেবতার নাম ‘রূপেশ্বর শিব’ ছাড়া অন্য কিছুই হতে পারত না।
জন্মেঞ্জয় মল্লিক দেবতার নামকরণেও তাঁর প্রজ্ঞার প্রমাণ রেখে গিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী মাণিক চন্দ্র মাইতি, গৌর চন্দ্র ঘোষ, শিবপ্রসাদ ঘোষ, ডিজাষ্টার ম্যানেজমেন্ট বিভাগের মহকুমা আধিকারিক, আদিত্য দাশ, পুরোহিত—খরিদা।
পথ-নির্দেশঃ  বাস-ট্রেন যে কোনও পথে খড়গপুর বা গিরি ময়দান স্টেশনে পৌঁছে, কয়েক পা উত্তরে রূপেশ্বর শিব মন্দির।

- Advertisement -
Latest news
Related news