Sunday, July 21, 2024

Temple Tell: জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল- ১৪৫ ।। চিন্ময় দাশ

- Advertisement -spot_imgspot_img

জীর্ণ মন্দিরের জার্ণাল
চিন্ময় দাশ
মদনমোহন মন্দির, নৈপুরগড় (পটাশপুর)

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

দিল্লী অধিকারের পর, একের পর এক এলাকায় যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন আলাউদ্দিন খিলজী। নির্মম অত্যাচার, প্রাণহানি, ধর্মান্তরকরণ, নারীনির্যাতন, অবাধ লুন্ঠন কোন কিছুরই অভাব ছিল না।
সেসময় রাজপুতানা এবং গুজরাত এলাকা থেকে বহু ক্ষত্রিয় শোলাঙ্কি রাজপুরুষ প্রাণ এবং স্বধর্ম রক্ষার তাগিদে, দেশত্যাগী হয়ে চলে এসেছিলেন। তাঁদেরই একটি শাখা পুরী পৌঁছে জগন্নাথ দর্শন সেরে, মেদিনীপুরের কেদারকুণ্ড পরগণায় এসে পৌঁছেছিলেন। দলপতি ছিলেন জনৈক মহাবীর সিংহ। ময়ুরভঞ্জ রাজার সনন্দ নিয়ে একটি জমিদারী প্রতিষ্ঠা এবং নিজের নামে একটি গ্রামও পত্তন করেছিলেন তিনি। জেলা গেজেটিয়ারেও তাঁর উল্লেখ আছে—“Bir Sing came to Midnapore about six hundred years ago and build himself a fort at Birsingpur in Pargana Kedarkunda. The fort of which the remains are still visible.”

পরে, গৌড়ের নবাব ইলিয়াস শাহ, ওডিশা আক্রমণে যাবার পথে বীরসিংহকে হত্যা করেন। সেসময় সেনাপতি ঘণশ্যাম সিংহের পরামর্শে, এবং তাঁরই নেতৃত্বে, শোলাঙ্কিগণ আবার বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।
ঘণশ্যামের দশম বংশধর রামচন্দ্র দেবসিংহ কালাপাহাড়ের হাতে নিহত হলে, তাঁর উত্তর পুরুষ পুরুষোত্তম দেবসিংহ অমর্ষি পরগণায় এসে থিতু হয়েছিলেন। জঙ্গল হাসিল করে নতুন বসত করেছিলেন সেখানে। নাম হয়েছিল—নয়াপুর। সেটিই পরে নৈপুর নামে পরিচিত হয়েছে।
পুরাবিদ তারাপদ সাঁতরার বিবরণে আছে, সতের শতকে এই বংশের চতুর্ভূজ দেব বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করে, মদনমোহনের এই মন্দির নির্মাণ এবং বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

তবে, সেবাইত পরিবার একটু অন্য বিবরণ দিয়েছেন। বলেছেন, তাঁরা ছিলেন গুজরাটের অধিবাসী। পূর্বকাল থেকেই শ্রীকৃষ্ণের উপাসক। একবার তীর্থ পরিক্রমারত একদল সাধু এসে জমিদারের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। বিদায়কালে ‘মদন মোহন’ নামের একটি বিগ্রহ দিয়ে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ জমিদার বাসুদেবের হাতে। কুলদেবতা হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছিল বিগ্রহটিকে। দেবতার মন্দিরটি গড়ে উঠেছিল বাসুদেব এবং পরের জমিদার তাঁর পুত্র সীতারাম দেবের হাতে।

বাসুদেবের কনিষ্ঠ পুত্র দীনবন্ধু দেব মোগল সরকারের রাজস্ব আদায় সংক্রান্ত ‘কানুনগো’ পদে নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী চারজন বংশধরও নিযুক্ত হয়েছিলেন এই পদে। তখন থেকে নৈপুরগড়ের এই জমিদারবংশ ‘কানুনগো’ পদবী ব্যবহার করে আসছেন।
সেসব যাক। যাঁর হাতেই গড়ে উঠুক, মন্দিরটি এখনও বেশ সযত্ন রক্ষিত এবং সুদর্শন। সেবাপূজার ধারাটিও অবিচ্ছিন্ন ভাবে চালু আছে।
পূর্বমুখী ইটের মন্দির। নির্মিত হয়েছে শিখর দেউল রীতিতে। সামনে তিন-চালা ছাউনির একটি জগমোহন। পিছনে প্রায় ৫০ ফুট উঁচু ঋজু গড়নের বিমান (মূল মন্দির) সৌধ।

জগমোহনের মাথায় চালা ছাউনি। কিন্তু কার্ণিশগুলি সরলরৈখিক। পূর্বদিক ছাড়া, উত্তর ও দক্ষিণেও দুটি দ্বারপথ আছে জগমোহনের।
মাঝখানে একটি প্রশস্ত রাহাপাগ, দুই কোণে দুটি কণকপগ এবং রাহার দু’দিকে দুটি করে অনর্থপগ—এই নিয়ে মন্দিরের চারদিকের দেওয়ালে ‘সপ্তরথ’ বিন্যাস করা।
মন্দিরের শীর্ষক অংশে বেঁকি, দুটি আমলক, খাপুরি, চারটি কলস এবং বিষ্ণুচক্রে সুশোভিত হয়েছে সৌধটি।
একটি প্রতিষ্ঠা ফলক আছে মন্দিরে। তার বয়ানটি এরকম—“ ওঁ নমো নারায়ণায় / শ্রীশ্রী মদন মোহন জীউ নম / স্থাপিত ইং ১৬৬৫ সাল “। (যদিও, ইংরেজ আগমণের পূর্বে, এভাবে ইংরেজি সাল-এর উল্লেখ, প্রশ্নের জন্ম দেয়।)
ভোগশাল, অতিথি নিবাস ইত্যাদি নিয়ে, উঁচু প্রাচীরে ঘেরা দেবালয়। দাক্ষিণাত্য এলাকার ‘ফোর্ট টেম্পল’ যেন!
এক কথায় ভারি সুদর্শন এই মন্দির। গর্ভগৃহে আসীন বিগ্রহের নাম—মদন মোহন। তাঁর মন্দিরটিও যেমন সুশোভন, তেমনই মনমোহনও।
সাক্ষাৎকারঃ সর্বশ্রী দীপক দাস কানুনগো, আসিত দাস কানুনগো, সুকুমার দাস কানুনগো—নৈপুরগড়।
পথ-নির্দেশঃ মেদিনীপুর-দীঘা রাস্তার এগরা থেকে, পটাশপুর হয়ে উত্তরে নৈপুর। অথবা, কলকাতা-দীঘা রাস্তার বাজকুল থেকে পাটাশপুর পৌঁছানো যাবে। এছাড়া, মুম্বাই রোডের ডেবরা কিংবা বালিচক স্টেশন থেকে পটাশপুর গামী পথের উপরেই নৈপুরগড়।

- Advertisement -
Latest news
Related news