Sunday, July 14, 2024

ক্রান্তিকালের মনীষা-১০৯।। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ।। বিনোদ মন্ডল

- Advertisement -spot_imgspot_img

জনসংঘ-প্রতিষ্ঠাতা
শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বিনোদ মন্ডল

আরো খবর আপডেট মোবাইলে পেতে ক্লিক করুন এখানে

সালটা ১৯৪৩। অনন্যোপায় মহাত্মা গান্ধী কারাগারে অনশন শুরু করলেন। অগ্নিগর্ভ আসমুদ্র হিমাচল আলোড়িত হল। প্রতিবাদ আন্দোলনে পথে নামলেন প্রতিটি স্বাধীনতাকামী দেশবাসী। কলকাতায় কমিউনিস্টদের উদ্যোগে বিরাট প্রতিবাদ সভার ডাক দেওয়া হল। সভায় প্রধান বক্তা তীক্ষ্ণধী সোমনাথ লাহিড়ী। মির্জাপুর পার্কে (শ্রদ্ধানন্দ পার্ক ) আয়োজিত ইতিহাস -বিস্মৃত সেই সভায় সভাপতির আসন গ্রহণ করেন হিন্দু মহাসভার তদানীন্তন সভাপতি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য ড.শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (০৬.০৭.১৯০১ — ২৩.০৬. ১৯৫৩)।

বাবা ছিলেন বাংলার বাঘ। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং বিচারক। মা যোগমায়া দেবী। কলকাতার ভবানীপুরে ভূমিষ্ঠ হন তাঁদের এই মেধাবী দ্বিতীয় সন্তান। আদি নিবাস ছিল হুগলী জেলার জিরাট বলাগড়ে। বিখ্যাত পিতার পুত্র হওয়ার সুবাদে কিছু বাড়তি সুবিধে যেমন পেয়েছেন , তেমনি নানা বিতর্কে জড়িয়েছেন আজীবন। ১৯১৭ সালের মার্চ মাসে বয়স ষোলো বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষায় বসেন, যা ছিল সেকালের প্রচলিত আইনবিরুদ্ধ।

ভবানীপুর মিত্র ইনস্টিটিউশন হয়ে প্রেসিডেন্সী কলেজে (১৯২১) ইংরেজি অনার্স পাস করেন। পরে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে এম. এ. এবং লন্ডনে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অর্জন করেছিলেন বি.এল. , বার -এট -ল. ,ডি. লিট এবং এল. এল. ডি. উপাধি।

তখনকার দিনে আইনের ডিগ্রিগুলো যথেষ্ট পরিশ্রম করে অর্জন করতে হত। বহু বিখ্যাত ব্যক্তি মাঝে মাঝে এক একটি পেপারে ফেল করতেন। ব্যর্থতার স্বাদ পেয়েছিলেন তিনিও।
বাবা কলকাতা বিশ্ব- বিদ্যালয়ের প্রাণপুরুষ হওয়ায় ছাত্রাবস্থা থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা প্রশাসনিক কাজে তাঁকে সাহায্য করতেন শ্যামাপ্রসাদ। ১৯৩৪ সালে মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদে আসীন হন। ছিলেন ১৯৩৮ পর্যন্ত। পাশাপাশি পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কাউন্সিল অব্ আর্টসের সভাপতিও ছিলেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকাশে তাঁর বিচিত্র অবদান সর্বজন স্বীকৃত। মহত্তম অবদান মনে হয় , আশি বছর জুড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচ -কানাচ -গম্বুজ- খিলানে যে ইংরেজি আধিপত্যের নির্মম ঐতিহ্য অনুশীলিত হয়েছিল তা ভেঙে দেওয়া। ১৯৩৭ সালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সমাবর্তনে এসে বাংলায় ভাষণ দেন। শ্যামাপ্রসাদই রবীন্দ্রনাথকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট প্রফেসর পদে নিয়োগ করেন।

শুধু তাই নয় শ্যামাপ্রসাদই কবিগুরুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি থিম সং রচনার অনুরোধ করেন। প্রসন্ন কবিগুরু দু’ দুটি গান লিখে দেন। “চলো যাই চলো যাই “এবং “শুভ কর্মপথে ধর নির্ভয় গান”। প্রথম গানটি সেবারে নির্বাচিত হয় ও ১৯৩৭ সালের ২৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠাদিবসে আয়োজিত কুচকাওয়াজে ছাত্রদের দ্বারা পরিবেশিত হয়। দ্বিতীয় গানটিও মর্যাদার সাথে পরিবেশিত হয় ২০০৭ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ধশতবর্ষে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় সংগীতের মর্যাদা লাভ করেছে “শুভ কর্মপথে” সংগীতটি।

অরাজনৈতিক পিতার শিক্ষাবিদ পুত্র যৌবনেই রাজনীতিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হন। বারংবার নির্বাচিত হয়ে ১৯৪৫ পর্যন্ত ঐ পদে আসীন ছিলেন। অসামান্য সাংগঠনিক দক্ষতায় হিন্দু মহাসভার সভাপতির আসনে অলংকৃত হন। তবে মতের মিল না হাওয়ায় ১৯৪৮ সালে হিন্দু মহাসভার কার্যকরি সভাপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন ।

শ্যামাপ্রসাদ ভারতীয় গণপরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হন। স্বাধীনতার প্রাক্কালে দেশে সীমানা নির্ধারণে বিশেষতঃ বাংলা ও বাঙালির স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। নিজ গুণেই জওহরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রীসভায় সংযুক্ত হন তিনি। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট দেশের প্রথম শিল্প ও পরিবহণ মন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তখন তিনি হিন্দু মহাসভার মহা সংগঠক। অনুগামীদের পরামর্শ দেন জাতি গঠনের কাজে সবাইকে একযোগে সামিল হতে হবে। নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাজে আত্মনিয়োগ করেন তাঁর অনুগামীরা।

বছর তিনেক শিল্প মন্ত্রী ছিলেন তিনি। শিল্প উন্নয়ন নিগম প্রতিষ্ঠা সহ দেশের প্রথম শিল্পনীতি প্রণয়ন ছিল শ্যামাপ্রাসাদের অন্যতম কৃতিত্ব। ঐ সময় চিত্তরঞ্জন লোকোমোটিভ স্থাপন ও সিন্ধ্রি সার কারখানা নির্মাণের সিদ্ধান্ত কার্যকর হয়।

খড়্গপুরে ভারতবর্ষের প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব্ টেকনোলজি প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্নবীজ রোপন করেন ডা. বিধান চন্দ্র রায় ; তাকে ফলবতী করা তাঁর প্রধান কীর্তি। ভুলে গেলে চলবেনা কলকাতার বুকে তিনিই স্থাপন করেন প্রথম ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব্ সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার এন্ড বিজনেস ম্যানেজম্যান্ট।

১৯৫০ সালে পূর্ববঙ্গে হিন্দুদের ওপর ক্রমবর্ধমান অত্যাচারের ঘটনায় ব্যথিত হন শ্যামাপ্রসাদ। হত্যা ,লুণ্ঠন ,নারী নির্যাতন প্রাত্যহিক রোজ নামচায় রূপান্তরিত হয়। দিল্লীর সরকারের উদাসীনতা ও ভুল পদক্ষেপের প্রতিবাদ করেন তিনি। কুখ্যাত নেহরু -লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করে ১৪এপ্রিল (১৯৫০) পদত্যাগ করেন। ভারতীয় জনতা পার্টির শীর্ষ নেতৃত্ব জগৎপ্রসাদ নাড্ডা সম্প্রতি এই ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছেন -‘নেহরু মন্ত্রীসভা থেকে তাঁর (শ্যামা প্রসাদের )পদত্যাগ দেশের রাজনৈতিক বিকল্পের উত্থানের পূর্ব সূত্র ‘।

নেহরু ও জাতীয় কংগ্রেসের কাশ্মীর নীতি তিনি মেনে নিতে পারেননি। তাঁর স্লোগান ছিল ‘এক দেশ মে দো বিধান, দো প্রধান আউর দো নিশান নেহি চলেগি’। নতুন দল গঠন প্রতিষ্ঠা করলেন তিনি। নিখিল ভারত জনসংঘ (১৯৫১)। এই দলের প্রার্থী হয়েই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে দক্ষিণ-পূর্ব কলকাতা কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থীকে পরাস্ত করে লোক সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

জম্বু ও কাশ্মীরকে ভারত ভুক্তি করবার জন্য সত্র্যাগ্রহ আন্দোলন শুরু করেন। বহু দেশবাসী তাঁর আন্দোলনে সামিল হন। কিছুদিন কারারুদ্ধ করা হয় শ্যামাপ্রসাদকে। ১৯৫৩ সালের মে মাস নাগাদ পুনরায় কাশ্মীরের পরিস্থিতি সরজমিনে চাক্ষুষ করে জম্বুতে প্রবেশ করেন শ্যামাপ্রসাদ। কাশ্মীর সরকার তাঁকে পুনরায় কারারুদ্ধ করে। বন্দি দশাতে অসুস্থ হয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি হন। প্লুরিসি রোগে আক্রান্ত ছিলেন তিনি। আকস্মিক হৃদরোগে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

তাঁর মৃত্যু নিয়েও নানা বিতর্ক প্রচলিত রয়েছে। নেহরু সরকার তাঁকে হত্যা করেছে, একাংশ অভিযোগ করেন। তাঁকে যেসব মেডিসিন দেওয়া হয় তা নিয়েও নানা রহস্য দানা বাঁধে। তাঁর বিধবা মা প্রধানমন্ত্রীকে এই মৃত্যু নিয়ে তদন্তের অনুরোধ জানান, যদিও তা রক্ষা করা হয়নি।

তাঁর স্ত্রী সুধাদেবী (বিয়ে ১৯২২) ১৯৩৩ সালে প্রয়াত হয়েছিলেন। মৃত্যুকালে মা, তিনভাই দুই পুত্র ও দুই কন্যাকে রেখে যান।

২০১৯ সালের আগস্ট মাসে কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের ৩৭০ ধারা বিলোপ করে শ্যামাপ্রাসাদের প্রতি জাতির পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছে। ভারতের কল্যাণে এই পদক্ষেপ কতখানি ইতিবাচক হয়েছে -তার উত্তর দেবে অনাগত ভবিষ্যৎ।★

- Advertisement -
Latest news
Related news